
২০১৪ সালে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতে নরেন্দ্র মোদি যখন প্রথমবারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন, ঠিক তার পরের কথা। সে সময় লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানো বিএনপি নেতা তারেক রহমান মনে করেছিলেন, ভারতের ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্ক শুধরে নেওয়ার এটা একটা দারুণ সুযোগ।
এই ধারণার একটা ভিত্তি অবশ্যই ছিল। তার আগে দীর্ঘ দশ বছর ভারতের ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট –প্রধানমন্ত্রীর পদে মনোমোহন সিং থাকলেও ক্ষমতার রাশ যে গান্ধী পরিবারের হাতেই ছিল, সেটা কারও অজানা নয়। আর সোনিয়া গান্ধী ও তার ছেলে-মেয়ে রাহুল-প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের ঘনিষ্টতাও ছিল নিবিড়। দলীয় স্তরে কংগ্রেস ও আওয়ামী লীগের মধ্যেও রীতিমতো সুসম্পর্ক বহুকাল ধরেই।
তারেক রহমান ও তার রাজনৈতিক পরামর্শদাতারা তখন ভেবেছিলেন, ক্ষমতা থেকে কংগ্রেস তথা গান্ধী পরিবারের বিদায় দিল্লির সঙ্গে বিএনপি-র নতুন সমীকরণের পথ প্রশস্ত করবে। তাছাড়া ভারতের নতুন শাসক দল বিজেপি ও বাংলাদেশের তখনকার বিরোধী দল বিএনপি – উভয়েই যেহেতু দক্ষিণপন্থি বা ‘সেন্টার রাইট’ রাজনীতির জন্য পরিচিত – তাই এরকম দুটো দলের মধ্যে ‘স্বাভাবিক মিত্রতা’ বা ন্যাচারাল ফ্রেন্ডশিপ গড়ে ওঠাটা স্বাভাবিক, এমন একটা ভাবনাও অবশ্যই কাজ করেছিল।
যেমন ভাবা, তেমনই কাজ।
বিএনপি-র সঙ্গে বিজেপির এই দৌত্যর কাজটা করেছিলেন তখন ‘ওভারসিজ ফ্রেন্ডস অব বিজেপি’ বা বিজেপির বৈদেশিক শাখার নেতা, দিল্লির বিজয় জলি। তার হাত দিয়েই নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য প্রীতি উপহার ও শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছিল ‘টিম তারেক রহমান’। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই সৌজন্যে তখন উল্টোদিক থেকে প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি।
এর কারণ ছিল মোটামুটিভাবে দু’টো।
এক, তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার নতুন মোদি সরকারের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য খুব দ্রুত উদ্যোগ নিলেন; এবং তাদের পক্ষ থেকে এটাও ভারতকে বুঝিয়ে দেওয়া হলো যে, দিল্লির সঙ্গে তারা সবরকম সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। কিন্তু ভারত যদি বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখে, তাহলে সেটা আওয়ামী লীগের জন্য কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না। মানে অন্যভাবে বললে, ‘আপনারা যদি বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কথা ভাবেন, তাহলে আমাদের আমাদেরকে বরং ভুলে যান!’
দুই, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তখনও দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, চট্টগ্রামে দশ ট্রাক অস্ত্রপাচার মামলা বা শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলার মতো ঘটনায় তারেক রহমান বা তার ঘনিষ্ঠজনদের সরাসরি যোগসাজশ ছিল। সে সময় ভারতের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থায় কর্মরত ছিলেন, এমন একজন অফিসারের কথায়, ‘আমরা তখন ধরেই নিয়েছিলাম, ভারতের নিরাপত্তার জন্য যেগুলোকে রেড লাইন বলে ধরা হয় তারেক রহমান এমন কিছু লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম করেছেন, তার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক গড়ার আগে আমাদের বহুবার ভাবেতে হবে।’
সুতরাং একদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের চাপ, আর অন্যদিকে ভারতের চোখে তারেক রহমানের প্রশ্নবিদ্ধ অতীত – এই দুটো ফ্যাক্টরের কারণেই ভারতে মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের সঙ্গে তারেক রহমান তথা বিজেপির সম্পর্ক সেভাবে দানা বাধতে পারেনি।
এই দৃশ্যপটে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটলো ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট।
ক্ষমতা থেকে শেখ হাসিনার চমকপ্রদ বিদায় ও ভারতে এসে আশ্রয় নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই কিন্তু ভারত অনুধাবন করেছিল, তাদের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসন কিন্তু সহজ হবে না। কিন্তু পাশাপাশি বিএনপি সম্পর্কে মনোভাব নমনীয় করার জন্যও তারা কিছুদিন পরিস্থিতি দেখে নিতে চাইছিল, আর সে কাজেই সময় লেগে গিয়েছিল প্রায় সাত-আট মাস।
ঢাকায় ভারতের সাবেক এক হাই কমিশনার বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন, ‘তারেক রহমান বা বিএনপি-কে নিয়ে আমাদের অস্বস্তির জায়গাটা ছিল, ভারত সম্বন্ধে তাদের দলীয় নীতিটা কী সেটা তারা কখনোই আগে স্পষ্ট করে বলেনি। আর দ্বিতীয়ত, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তাদের সম্পর্কটা কী বা কতটা, সেটাও পরিষ্কার করা দরকার ছিল – কারণ বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ভারত এখনো জামায়াতকে দেখার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়!’
২০২৪-র ৫ অগাস্টের পর থেকে এখানে দুটো তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে। এক, জামায়াত যেকোনও কারণেই হোক তাদের পুরোনো জোটসঙ্গী বিএনপি-র সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে থাকে – এবং ভারত সেটাকে একটা ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবেই দেখতে থাকে। জামায়াত আর বিএনপি-র মধ্যে যে শেষ পর্যন্ত কোনও নির্বাচনি সমঝোতা হচ্ছে না সেটাও ভারতের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, জুলাই বিপ্লবের সময় থেকে বাংলাদেশের রাজপথ ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’ স্লোগানে মুখরিত হলেও ভারত মনে করছে দল হিসেবে বিএনপি কিন্তু খোলাখুলি উগ্র ভারত-বিরোধিতার রাস্তায় হাটেনি। ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকার যে সব চুক্তি করেছিল বিএনপি সেগুলো সব এক কথায় খারিজ করারও দাবি জানায়নি, বরং তারা একটা দুপক্ষের জন্য মর্যাদাজনক পররাষ্ট্রনীতির ওপরেই জোর দিয়েছে।
এমনকি, লন্ডনে থাকাকালীন গত অক্টোবরে তারেক রহমান বিবিসিকে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, তাতেও তিনি সরাসরি ভারতকে আক্রমণ করার রাস্তায় যাননি। শেখ হাসিনাকে ভারতের আশ্রয় দেওয়ার প্রসঙ্গেও বলেছিলেন, ভারতকেই তার সিদ্ধান্তের দায় নিতে হবে – কিন্তু ভারত থেকে যেভাবে হোক হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে আমরা বিচারের মুখোমুখি করা হবে – এমন কোনও মন্তব্য করেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই রাজনৈতিক বাস্তবতাই আসলে তারেক রহমান সম্পর্কে ভারতকে মনোভাব বদলাতে বাধ্য করেছে। এর সঙ্গে রয়েছে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও নানা ধরনের তাগিদ।
শেখ হাসিনার আমলে ভারত বাংলাদেশে শত শত কোটি ডলারের বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছিল, সেগুলোর ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত – অনেক প্রকল্পের কাজই অনির্দিষ্টকাল ধরে থমকে আছে। যেমন, আগরতলা-আখাউড়া রেল সংযোগের কাজ প্রায় শেষের পথে থাকলেও তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি। অন্যদিকে, পুরোনো ট্রেন পরিষেবাগুলোও গত দেড় বছর ধরে বন্ধ। অথচ এই সব প্রকল্পে ভারতেরও বিপুল ‘স্টেক’ রয়েছে।
আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য বা পর্যটকদের চলাচলেও ভাটার টান – যদিও তার পেছনে ভারতেরই বেশ কিছু সিদ্ধান্তও দায়ী, যেমন স্থল সীমান্ত দিয়ে পণ্য চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ বা বাংলাদেশে স্বাভাবিক ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রাখা ইত্যাদি।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তারা যেভাবে ঘন ঘন বাংলাদেশ সফর করছেন, সেটাও কিন্তু ভারতের নীতি নির্ধারকদের ও নিরাপত্তা অ্যাপারেটাসের কর্মকর্তাদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাজ ফেলেছে। বাংলাদেশের ভূখন্ডে উত্তর-পূর্ব ভারতের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো আবার মদদ পাবে ক না, এটাও এখন দিল্লিতে একটা গুরুতর আলোচনার বিষয়।
এ প্রসঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুকল্যাণ গোস্বামী বলেন, ‘দিল্লি এখন মনে করছে, বাংলাদেশে একটা নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার না আসা পর্যন্ত বাংলাদেশের এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়া অসম্ভব। আর বিএনপি-ই ভারতের জন্য এই মুহূর্তে একমাত্র বাস্তবসম্মত অপশন, সে কারণেই ভারতও বাংলাদেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকেই চাইছে।’
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন









































