প্রচ্ছদ জাতীয় আন্দোলনে গিয়ে ছেলে পঙ্গু, খালেদা জিয়ার জানাজায় স্বামীর মৃত্যু

আন্দোলনে গিয়ে ছেলে পঙ্গু, খালেদা জিয়ার জানাজায় স্বামীর মৃত্যু

২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে ছেলে তাহসীন হোসেন (১৫)। আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে গিয়ে অসুস্থ এবং পদদলিত হয়ে মারা গেলেন স্বামী নিরব হোসেন (৫৬)।

বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সকালে পঙ্গু ছেলে ও স্বামীর লাশ নিয়ে পটুয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে এসেছেন তাহেরা বেগম (৪০)। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামীকে হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করা ছেলে তাহসীনকে নিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন এ নারী। তাকিয়ে আছেন শূন্য। একটাই প্রশ্ন পঙ্গুত্ব বরণ করা ছেলে তাহসীন এবং মেয়ে নাফিজা নওরীনকে নিয়ে কীভাবে দিন যাবে তার। তার এই তিন সদস্যের সংসার কীভাবে চলবে?

নিরব হোসেনের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের বড়ডালিমা গ্রামে। তিনি বিএনপিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং দলটির একজন সক্রিয় সমর্থক ছিলেন। তিনি বুধবার বিকালে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে যান। জানাজা শেষে অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে ফেরার পথে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং পদদলিত হন। পরে উপস্থিত লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বৃহস্পতিবার বিকালে স্থানীয় বড় ডালিমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আর্থিক অনটনের কারণে ঢাকায় পাড়ি জমান নিরব হোসেন। ঢাকার বড় মগবাজার এলাকার ডাক্তার গলিতে একটি ভাড়া বাসায় দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে সংসার চালাতেন। উপার্জন সামান্য হলেও সুখেই ছিল পরিবারটি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, পরিবারের কাউকে না জানিয়েই একমাত্র ছেলে তাহসীন হোসেন (নাহিয়ান) জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার সঙ্গে অংশ নেয়। ৪ আগস্ট বিকালে ঢাকার সায়েন্স ল্যাব এলাকায় মেরুদণ্ডে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সরকারিভাবে দেশে ও বিদেশে (থাইল্যান্ড) নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। কিন্তু সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাহসীন হোসেন তখন নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ইচ্ছা আছে তার। এখনও সে চিকিৎসাধীন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বাবাকে শেষ বিদায় জানাতে হুইল চেয়ারে করে গ্রামের বাড়ি বাউফলে এসেছেন তাহসীন হোসেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই সে দাঁড়াতে এবং হাঁটতে পারছে না।

জুলাইযোদ্ধা তাহসীন হোসেন বলেন, আমার বাবাই আমাকে দেখাশোনা করতো। আমি ঢাকায় সিএমএইচে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল ছিলাম। মঙ্গলবার রাতে বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। বাবা ফোন করে জানতে চেয়েছেন, হাসপাতালে কেমন আছি, রাতে খাবার খেয়েছি কি না। আমাকে দেখাশোনা করার মতো পরিবারে আর কেউ নাই। জানি না এখন আমাদের সংসার কীভাবে চলবে? আমার দেখভাল কে করবে?

তাহেরা বেগম বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিতে গিয়ে একমাত্র ছেলে তাহসীন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়। গুলির আঘাতে তার মেরুদণ্ডের স্পাইনাল কর্ড ছিঁড়ে যায়। পঙ্গু হয়ে গেছে, হাঁটতে পারে না। প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করা হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরে তাকে সিএমএস হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পরও সুস্থ না হওয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে পাঠানো হয়। সেখানে চার মাস চিকিৎসাধীন থাকার পরও তার অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। পরে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে সিএমএইচ হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। কোমরের নিচের অংশ অবশ হয়ে গেছে। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার মতো বোধ নেই ওর। শিশু বাচ্চাদের মতো প্যাম্পার্স পরিয়ে রাখতে হয়। খুবই দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হয়। চার সদস্যের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন স্বামী নিরব হোসেন। তিনি মারা যাওয়ায় তিন সদস্যের সংসার চালানোর মতো কোনও সামর্থ্য নেই।

নিরব হোসেনের জানাজায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ও পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল আলম তালুকদার অংশ নিয়েছেন।

কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, নিরব হোসেনের মৃত্যুর খবর তারেক রহমান জানতে পেরে ফোন করে বলেছেন, এই পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে। তার ছেলে জুলাইযোদ্ধা তাহসিনের চিকিৎসার জন্য দেশে বা বিদেশে যা কিছু করা প্রয়োজন, তা করা হবে। পরিবারে কেউ কর্মক্ষম থাকলে তাকে কাজের ব্যবস্থাও করা হবে। বিএনপি সব সময় এই পরিবারের পাশে থাকবে। এতে তিনি তারেক রহমানের নির্দেশে জেলা বিএনপির নেতাদের নিয়ে এসেছেন নিহতের পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য।