
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে কেন্দ্র করে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আলোচনা-সমালোচনা এবং বিভিন্ন বিতর্ক তৈরি একটি নিয়মিত দৃশ্যপট হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগসহ বিরোধীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য। তাকে ঘিরে রাজপথ ও সংসদে বিরোধী দলগুলোর সমালোচনা-আক্রমণ দিন দিন তীব্র হচ্ছে। ইদানীং তাকে নিয়ে আওয়ামী আমলের কিছু মনগড়া ও মিথ্যা ঘটনাকেও সামনে আনা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই তার বিরুদ্ধে কাল্পনিক তথ্য অপপ্রচার করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সর্বশেষ তিন দিন আগে এনসিপির শীর্ষ নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ ফেসবুকে সমালোচনা করে পোস্ট করেছেন। তার ওই পোস্টের পর এই বিতর্ক নতুন করে উসকে উঠেছে। মূলত বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে মতবিরোধ শুরু হয়। কেননা, কমিশনের প্রায় ৯ মাসের সংলাপে সালাহউদ্দিন আহমদ বিভিন্ন বিষয়ে বিএনপির অবস্থান ও তার পক্ষে অকাট্য যুক্তি তুলে ধরেন। এরপর সংসদে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল—সব মিলিয়ে বিরোধী শিবিরের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নিশানায় সালাহউদ্দিন আহমদ।
বিভিন্ন সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ, জামায়াত এবং এনসিপি—সবার টার্গেটে পরিণত হয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। কারণ তারা সবাই জানেন, চৌকস এই রাজনীতিককে কোণঠাসা করা গেলে বিএনপিকে দুর্বল করা সম্ভব হবে।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে এবং বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সালাহউদ্দিন আহমদের গঠনমূলক ও অকাট্য যুক্তিতর্কের মুখোমুখি হতে না পেরেই বিরোধীরা প্রায়ই নীতিগত বিতর্কের পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও মনগড়া অভিযোগের পথ বেছে নিচ্ছেন। তবে জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে গঠনমূলক আলোচনা ও নীতিভিত্তিক সমালোচনার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা মনগড়া অভিযোগ তোলা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থি। সালাহউদ্দিন আহমদের মতো সিনিয়র রাজনীতিকের যুক্তিভিত্তিক অবস্থানকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে অহেতুক বিতর্কের সুযোগ তৈরি করা বিরোধী রাজনীতির জন্যই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
উল্লেখ্য যে, পতিত আওয়ামী লীগের সময় গুম হওয়ার ৬২ দিন পর ২০১৫ সালের ১১ মে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলংয়ে সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্ধার করা হয়। তবে সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার তাকে দেশ ফিরতে দেয়নি। পরিবার থেকে ছিলেন বিচ্ছিন্ন। প্রায় সাড়ে ৯ বছর পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে তিনি দেশে ফিরেন। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় এক দশক ভারতে বাধ্য হয়ে নির্বাসনে ছিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। শুধু তাই নয়, সেখানে থেকেই আওয়ামী বিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। এরপর দেশে ফিরেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে বিএনপির পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
জানা যায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার দপ্তর নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করছেন। তবু ছোটখাটো বিষয়ে তাকে জড়িয়ে অহেতুক সমালোচনা করা হয়। এমনকি তার পরিবারের আয় ও সম্পদ নিয়েও সমালোচনা হয়। অথচ আওয়ামী লীগ আমলে তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যদের আয়কর নথি তন্ন তন্ন করে যাচাই করেও কোনো অসংগতি বা অবৈধ আয়ের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ কথা তো অত্যুক্তি নয় যে, সালাহউদ্দিন আহমদ সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। তিনি একজন মেধাবী ও জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ এবং সাবেক আমলা। তার জনপ্রিয়তার কারণে ২০০৮ সালে তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ নির্বাচন করে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। আওয়ামী আমলে বিএনপির সম্মুখসারির নেতা হিসেবে অনেকবার কারাবরণ করেছেন। সর্বশেষ তাকে গুম করা হয়েছিল। ফলে বাধ্য হয়ে প্রায় দশ বছর তাকে ভারতের মাটিতে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে। চব্বিশের অভ্যুত্থানে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি দেশে ফিরেছেন। বিএনপির প্রতিনিধি হয়ে ঐকমত্য কমিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দিনরাত পরিশ্রম করছেন। এরপরও তাকে নিয়ে নানামুখী ট্রল করা হচ্ছে। আওয়ামী আমলের ভুয়া মামলায় সাজার বিষয়গুলো সামনে এনে মূলত অন্যায়ের স্বীকৃতি দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। সম্প্রতি হাসনাত আবদুল্লাহ আওয়ামী আমলের বেশকিছু কাল্পনিক বিষয় ফেসবুকে লিখেছেন। তাহলে প্রশ্ন উঠেছে যে, এর মাধ্যমে এনসিপি নেতা এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ কি আওয়ামী লীগ আমলের মিথ্যা মামলাসমূহের আইনি ভিত্তি দিতে চাচ্ছেন?
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে জামায়াত, এনসিপিসহ বিরোধী দলগুলোর মতপার্থক্যের শুরু হয় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জুলাই সনদ প্রণয়নকে কেন্দ্র করে। ঐকমত্য কমিশনে সনদ প্রণয়ন নিয়ে অনুষ্ঠিত সংলাপে বিএনপির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। সেই সংলাপে সংবিধান সংস্কার, সংসদের উচ্চকক্ষ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, সাংবিধানিক ও স্বাধীন কমিশন, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচনকালীন ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে বিএনপির অবস্থান ও তার পক্ষে অকাট্য যুক্তি তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। এসব বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের সঙ্গে তার একাধিকবার তর্ক-বিতর্কও হয়। তবে বেশকিছুর ক্ষেত্রে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়। এ সময় সংবিধানের বিভিন্ন সাংবিধানিক ধারা ও উপধারা নিয়ে তার বক্তব্য ঘিরে তখন জামায়াত ও এনসিপির নেতাদের সঙ্গে তার পাল্টাপাল্টি যুক্তি-তর্ক হয়। সংলাপের সময় সালাহউদ্দিন আহমদকে তার বক্তব্য নিয়ে বিরোধী দলের নেতাদের কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়। নির্বাচনের আগে-পরেও এর রেশ অব্যাহত চলতে থাকে। এককথায় সালাহউদ্দিন আহমদের মেধা ও দক্ষতার কাছে বিরোধী পক্ষ তখন থেকেই চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে।
ঐকমত্য কমিশনে অংশ নেওয়া বিএনপির সমমনা কয়েকটি দলের নেতা জানান, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকগুলোতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত তৈরিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ যে যুক্তি ও তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন, তা বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে। তবে বিরোধীরা সেসব অকাট্য যুক্তি খণ্ডন করার বদলে নানা ধরনের হালকা ও খোঁড়া অভিযোগ তোলার নীতি গ্রহণ করেছে।
পুরোনো বিষয়ে অহেতুক পোস্ট: সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর দেওয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে সাইবার অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। তবে রাজনৈতিক সচেতন মহলের মতে, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর মতো জনপ্রতিনিধিদের গঠনমূলক সমালোচনার পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনগড়া ও মুখরোচক বক্তব্য প্রদান ট্রল সংস্কৃতিকে আরও উৎসাহিত করে। বিশেষ করে তিনি আওয়ামী আমলের মামলায় সাজা খাটার কথা লিখেছেন। তাহলে কী এ কথা বলা যায় যে, সেই সময় গায়েবি ও মিথ্যা মামলায় যেসব রায় হয়েছে সেগুলোকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে?
তাছাড়া বিভিন্ন সময় বিরোধীরা সালাহউদ্দিন আহমদের পারিবারিক সম্পত্তি ও রাজনৈতিক যোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও ট্রল উপস্থাপন করে আসছে। অথচ এসব দাবির পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট বা নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরতে পারেনি অভিযোগকারীরা। ব্যক্তিগত আক্রমণ ও পারিবারিক বিষয় টেনে এনে রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করার এই চেষ্টাকে রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে এই ধরনের অব্যাহত সমালোচনার নেপথ্যে কয়েকটি মূল কারণ রয়েছে। তার মধ্যে হচ্ছে—নীতিগত বিতর্কে পরাস্ত হওয়া। সরকারি নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর বা তথ্যভিত্তিক যুক্তি দিতে না পেরে ব্যক্তিগত আক্রমণকে হাতিয়ার করা। পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ট্রল। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনমতকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে সালাহউদ্দিন আহমদ ও তার পরিবারকে কেন্দ্র করে ট্রল বা গুজব ছড়ানো। জাতীয় পর্যায়ের মূল আলোচ্য বিষয় থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে ব্যক্তিগত কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত রাখা।
যা বলছেন বিশিষ্টজন ও বিশ্লেষকরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধী দলের প্রকাশ্য এ বিরোধ আগামী দিনে আরও জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের ভাষ্য, বিরোধী দলের এ অবস্থান সংসদীয় বিতর্কের বাইরে গিয়ে দেখতে হবে। আলোচনার টেবিলে বসে বিরোধ দুই পক্ষকেই মিটিয়ে ফেলার পরামর্শ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান কালবেলাকে বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদ মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি পড়ালেখায় ছিলেন প্রখর ও তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী। রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকার কারণে নিয়মিত ক্লাস করতে না পারলেও, আসার চেষ্টা করতেন। হয়তো নিয়মিত পড়াশোনাটা করতে পারতেন। তবে পরীক্ষার আগে কোন বই থেকে কী কী পড়তে হবে, সে বিষয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে সবসময় পরামর্শ নিতেন। আমি বলতাম যে, মহসিন হলে তো অনেক ভালো ছেলে আছে। তবে ওদের সঙ্গে আলোচনা করলেও তুষ্ট হতে পারত না। আমি যেহেতু ভালো ছাত্র ছিলাম ও আমার সঙ্গে কথা না বলে পরীক্ষা দিতে চাইত না এবং পড়তে চাইত না। অর্থাৎ, একজন ছাত্রের স্ট্যান্ডার্ড লেভেল তখনই ছিল ভেরি হাই। তিনি কিন্তু মাস্টার্সে ১৫তম হয়েছেন ১২০ জনের ভেতরে। সুতরাং তিনি মেধাবী ছিলেন, সেটি আমি লক্ষ করেছি। প্রচণ্ডভাবে লেখাপড়া করলে হয়তো ফার্স্টক্লাস পেয়ে যেতেন। ছাত্রাবস্থায় ছিলেন মিষ্টভাষী, সদালাপী ও ভালো ছেলে। পরে তো বিসিএস দিয়ে সিভিল সার্ভিসে যান এবং একসময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার এপিএস হন এবং চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে চলে যান।
অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান বলেন, পরে ফ্যাসিবাদ আমলে তাকে গুম করে ভারতের শিলংয়ে পাঠানো হয়। কোন পরিস্থিতিতে গুম করা হয়, সেটা তো জানি। তাকে শিলংয়ে ফেলে দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন আসে যে, কেন তাকে ফেলে দিল? যদিও আমি এ নিয়ে তাকে প্রশ্ন করিনি। তবে ব্যক্তিগত ধারণা যে, তিনি সিভিল সার্ভিসে ছিলেন এবং ওই সময় তো সিভিল সার্ভিস বা পুলিশ ও আর্মিতে যারা ছিলেন অনেকেই তার পরিচিত ছিলেন। সুতরাং তাদের সিমপ্যাথি থাকায় শিলংয়ে ফেলে দিয়ে আসে, তা না হলে তাকে ইলিয়াসের (নিখোঁজ ইলিয়াস আলী) মতো অবস্থা হতো। সালাহউদ্দিন তো প্রথমে সেখানে মামলায় লড়েছেন। তাকে গ্রেপ্তার করে রাখা হয়েছিল। মামলায় ছাড়ানোর জন্য নানান কাগজপত্র তৈরি করতে হয়। তিনি কিন্তু মামলায় নিম্ন আদালতে জিতে যান এবং ইন্ডিয়ান গভনর্মেন্ট আবার আপিল করে। তা ছাড়া তাকে আর ট্রাভেল পাস দিচ্ছিল না। তাকে আসতে দেওয়া হয়নি। সুতরাং তিনি তো সেখানে কোনো আরাম-আয়েশের জন্য ছিলেন না।
তিনি আরও বলেন, অনেকেই সালাহউদ্দিন আহমদকে বলে ভারতপন্থি, এমনকি গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এজেন্ট। আচ্ছা কোনো দেশ যদি কাউকে এজেন্ট বানায়, তাহলে কি প্রকাশ্যে ডেকে নিয়ে বানাবে নাকি গোপনে বানাবে? এজেন্ট তো হয় গোপনে। সুতরাং ইন্ডিয়ান সরকার এরকম একটা ভুল কাজ করবে যে, একটা লোককে বাড়িতে নিয়ে এজেন্ট বানাবে? মোসাদ বা সিআইএর এজেন্ট সবই তো হয় গুপ্তভাবে। সালাহউদ্দিন তো সেখানে ওপেনলি ছিলেন। অতএব, আমি যতবার তার সঙ্গে কথা বলেছি, দেখেছি—তিনি সবার আগে আমাদের দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেন। একজন দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ হিসেবে আমরা তাকে জানি। তাকে বাংলাদেশপন্থি হিসেবেই দেখেছি। ভারতপন্থি আমার কাছে প্রতীয়মান হয়নি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা প্রসঙ্গে বিএনপির গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ও মিডিয়া সেলের সদস্য অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান কালবেলাকে বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদ এ দেশের রাজনীতিতে সততা, নিষ্ঠা ও সর্বোচ্চ ত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক। বিগত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি যেভাবে দেশ ও জনগণের পক্ষে ভূমিকা রেখেছেন, তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। একটি দায়িত্বশীল পদে থেকে তিনি যখন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে নানা অহেতুক বিষয়ে জড়িয়ে চরিত্রহননের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান বলেন, গঠনমূলক সমালোচনা যে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ, কিন্তু কোনো ব্যক্তিস্বার্থ বা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব থেকে শিষ্টাচারবহির্ভূত কটু মন্তব্য ও অপপ্রচার চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিরোধী পক্ষকে আহ্বান জানাব—অহেতুক কাদা ছোড়াছুড়ি ও কুৎসা রটনা বন্ধ করে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক রাজনীতির চর্চা করুন।
প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) মো. রাশেদ খান কালবেলাকে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সেই ফ্যাসিবাদী জামানায় একজন নিপীড়িত ব্যক্তি। যাকে ৬১ দিন গুম রাখা হয়েছিল। সালাউদ্দিন আহমদের মেধা ওই সময়কার বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপটে যে ধরনের বক্তব্য, এটি আসলেই শেখ হাসিনার সাম্রাজ্যে আঘাত করেছিল। যে কারণে প্রতিহিংসার জায়গা থেকে তাকে শেখ হাসিনা গুম করে। আমরা লক্ষ্য করছি যে, বর্তমান বিরোধী দল জামায়াত এবং এনসিপি তাকে নিয়ে অপতথ্য ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে বক্তব্য রাখেন, তিনি মাঝেমধ্যে বিরোধী দলের ভুলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। এগুলো আসলে জামায়াত এবং এনসিপি মানতে পারছে না। তাদের কথা হলো, আসলে যা বলি ফেসবুকে তো দেখি যে মানুষ আমাদের পক্ষে। বাস্তবে তো সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে জাতীয় সংসদে আমরা ৯০ জন এমপিও একসঙ্গে যুক্তিতর্ক দিয়ে পেরে উঠি না। ফলে তারা এক ধরনের ক্ষুব্ধ হয়ে যায়। সেই ক্ষোভ এবং সেই প্রতিহিংসার জায়গা থেকে মূলত তারা একযোগে অনলাইনে ও অফলাইনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নানানভাবে আঘাত করে।
রাশেদ খান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে তারা মিথ্যা বয়ান তৈরি করে অপতথ্য প্রচার করে। ঠিক আওয়ামী লীগ যেভাবে সালাহউদ্দিন আহমদকে নিপীড়ন ও আঘাত করেছে, একইভাবে বর্তমান বিরোধী দলও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে শেখ হাসিনার মতো আচরণ করছে জামায়াত ও এনসিপি। সম্প্রতি এনসিপির কয়েকজন নেতা তার বিরুদ্ধে নানান ধরনের অপতথ্য প্রচার করছে।
তিনি আরও বলেন, দেখেন সেই ফখরুদ্দিন এবং মঈন উদ্দিনের জামানায় অনেক রাজনৈতিক নেতার চরিত্র হনন করে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনেছিল। আসলে তারা এক প্রকার শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসিয়েই সেফ এক্সিট নেয়। সুতরাং সেই ভারতীয় মদদপুষ্ট ফখরুদ্দিন-মঈন উদ্দিনের বয়ান যদি এখন হাসনাত আবদুল্লাহরা গ্রহণ করে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে মিথ্যাচার করে সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমার প্রশ্ন হলো, গণঅভ্যুত্থানের সময় হাসনাত আবদুল্লাহ কেন ১৯ জুলাই শহীদের রক্ত মাড়িয়ে আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করতে গিয়েছিল? সালাহউদ্দিন আহমদ তো হাসিনার সঙ্গে আপস করে নাই। হাসনাত আবদুল্লাহ তো হাসিনার সঙ্গে আপস করেছিল। এমনকি ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের নারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হয়, এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই সময়কার বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা আন্দোলন নিয়ে একটা প্রেস রিলিজ দেয়। যা চূড়ান্তভাবে দেখার জন্য হাসনাত আব্দুল্লাহকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি তার মতো করে ফেসবুকে পোস্ট করে দেন যে, আলোচনার দুয়ার খোলা আছে। অর্থাৎ হাসনাত আবদল্লাহ গণঅভ্যুত্থানের সময় এজেন্ট হয়ে কাজ করেছে। হাসিনাকে রক্ষার সব চেষ্টা সে করেছে। আজকে যদি শেখ হাসিনা ক্ষমতায় টিকে যেত, হাসনাত এবং সারজিস ঘটনাচক্রে যারা গণঅভ্যুত্থানের কথিত নায়ক তারা ছাত্রলীগের বড় বড় নেতা থাকত বা তারা আসলে হাসিনার দ্বারা পুরস্কৃত হতো। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ যারা নির্বাসিত ছিল এবং যারা আমরা বাংলাদেশে বারবার নিপীড়নের শিকার হচ্ছিলাম, আমরা অত্যাচারিত হতেই থাকতাম। হাসনাত আবদুল্লাহ কোটা সংস্কার আন্দোলনের আগে কখনো হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে? আসলে তারা ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। আজকে যদি ছাত্রলীগের এজেন্ট হাসনাত এবং সারজিস একজন নিপীড়িত গুম হওয়া সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে সেটি আসলে অনাকাঙ্ক্ষিত এবং এটি আসলে কখনোই গ্রহণযোগ্য না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা হেয় প্রতিপন্ন করা উচিত নয়। রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই একে অপরের মোকাবিলা করতে হবে। ব্যক্তিগত আক্রমণ যদি চলে আসে তখন আর রাজনীতি থাকে না। তিনি বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদ বিএনপির একজন মেধাবী রাজনীতিবিদ। তিনি সংবিধান, সংসদ, সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানী। সংবিধানের অনেক শক্তিশালী যুক্তি দেখাতে পারেন। তার মেধা দিয়ে তিনি বিএনপি ও দেশ জাতির হয়ে ভূমিকা রাখছেন। এরকম যারা আছেন, তাদের প্রত্যেককে মর্যাদা দেওয়া উচিত।









































