প্রচ্ছদ জাতীয় স্বামী এমপি প্রার্থী, স্ত্রী নির্বাচন পর্যবেক্ষক

স্বামী এমপি প্রার্থী, স্ত্রী নির্বাচন পর্যবেক্ষক

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে ব্যতিক্রমী ও আলোচনার জন্ম দেওয়া একটি ঘটনা সামনে এসেছে। একদিকে স্বামী সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করছেন, অন্যদিকে স্ত্রী নিবন্ধিত হয়েছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে। স্বামী নির্বাচনী এলাকায় ভোটের প্রচারে ব্যস্ত থাকবেন, আর স্ত্রী পর্যবেক্ষণ করবেন পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া—এমন ঘটনাই এখন আলোচনায়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবসায়ী নেতা আব্দুল আউয়াল মিন্টু সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্যদিকে তার স্ত্রী নাসরীন ফাতেমা আউয়াল নিবন্ধন নিয়েছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে।

নির্বাচনের আর ঠিক এক মাস বাকি। এরই মধ্যে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো জোটগতভাবে প্রচারণা শুরু করেছে। বিএনপি ও জামায়াত নির্বাচনে জয়ী হতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনও নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে জানিয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে ৮১টি সংস্থাকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। এসব নিবন্ধিত সংস্থার তালিকায় রয়েছে নাসরীন ফাতেমা আউয়ালের নাম।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে ৩৩টি সংস্থা। এর মধ্যে সর্বশেষ নিবন্ধন পাওয়া সংস্থাগুলোর একটি হলো উইমেন এন্টারপ্রিনিয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। এই সংস্থার চেয়ারপার্সন নাসরীন ফাতেমা আউয়াল। সংস্থাটির কার্যালয়ের ঠিকানা হিসেবে ঢাকার বীর উত্তম সি আর দত্ত রোডের অ্যাংকর টাওয়ার উল্লেখ করা হয়েছে।

আব্দুল আউয়াল মিন্টু মূলত ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে পরিচিত। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর চারদলীয় জোট সরকার গঠনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান, জেনারেল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালক এবং মাল্টিমোড গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

অন্যদিকে তার স্ত্রী নাসরীন ফাতেমা আউয়াল নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করার লক্ষ্যে উইমেনস এন্টারপ্রেনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ওয়েব) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, এমপি প্রার্থীর স্ত্রী নির্বাচন পর্যবেক্ষক হলে আইনগত কোনো বাধা নেই। তবে বিষয়টি তার জানা নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এনপিবি নিউজকে তিনি বলেন,
“নির্বাচন পর্যবেক্ষক হতে যে শর্তগুলো পূরণ করতে হয়, সেগুলো পূরণ করেই নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। এমপি প্রার্থীর স্ত্রী পর্যবেক্ষক হতে আইনগত কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কে কোথায় নির্বাচন করছেন বা তার স্ত্রী কেন পর্যবেক্ষক হয়েছেন—তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই ভালো বলতে পারবেন।”

তবে নির্বাচন কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টিকে স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখা হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি এনপিবি নিউজকে বলেন,
“নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতামতের ওপর ভিত্তি করেই নির্বাচনের মান ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হয়। কোনো প্রার্থীর নিকটাত্মীয় যদি পর্যবেক্ষক হন এবং সেই প্রার্থী পরাজিত হন, তখন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বিরূপ মন্তব্য এলে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে।”

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে উইমেন এন্টারপ্রেনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সভাপতি নাসরীন ফাতেমা আউয়ালের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

এদিকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক হওয়ার সুবিধা ও বাস্তবতা নিয়ে এক কলামে বর্তমান নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) শাখাওয়াত হোসেন লিখেছেন, বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা তুলনামূলক নতুন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচন থেকেই মূলত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ শুরু হয়।

তিনি উল্লেখ করেন, ফেমা, ব্রতী, অধিকার, জানিপপ ও ডেমক্রেসিওয়াচের মতো সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এসব সংস্থা এশিয়া ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে এবং এনডিআই ও আইআরআইয়ের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় কাজ করেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল।

তবে ২০০৮ সালের পর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি কমে আসে। কারণ হিসেবে প্রাক্‌-নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে নেতিবাচক মূল্যায়নের বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি। আগামী নির্বাচনেও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলগুলোর অংশগ্রহণ নির্ভর করবে নির্বাচন-পূর্ব পরিবেশ মূল্যায়নের ওপর।