
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশকে বিভিন্নভাবে চাপে রাখতে একের পর এক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে ভারত—এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে দিল্লি যে ঢাকাকে চাপে রাখতে মরিয়া, তা এখন অনেকটাই ওপেন সিক্রেট বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার মতো ঘটনায় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এর মধ্যেই সামনে এসেছে ভারতের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কেন্দ্রীয় বাজেটের তথ্য। বাজেটে ভারতের বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি কাটছাঁটের শিকার হয়েছে বাংলাদেশ।
বাজেট অনুযায়ী, বাংলাদেশের জন্য ভারতের বৈদেশিক সাহায্যের বরাদ্দ ১২০ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৬০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ, আগের তুলনায় বাংলাদেশে দেওয়া সহায়তা অর্ধেকে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বাজেট নথিতে আরও জানা যায়, আগের অর্থবছরে বাংলাদেশে ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও দুই দেশের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের কারণে প্রকৃতপক্ষে মাত্র ৩৪ দশমিক ৪৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের বিপরীতে ভারতের অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য সহায়তা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে অথবা বাড়ানো হয়েছে।
ভারতের বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া দেশগুলোর তালিকায় এবারও শীর্ষে রয়েছে ভুটান। এরপর রয়েছে নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা। এসব দেশের জন্য মোট সহায়তা বরাদ্দ বাড়িয়ে ৫ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা আগের বছরের ৫ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ বেশি।
এদিকে, এবারের বাজেটের আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো চাবাহার বন্দর প্রকল্পে অর্থায়নের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত এই প্রকল্পে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছিল। পরে ২০২৫-২৬ সালের প্রাথমিক বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে আবার ৪০০ কোটি টাকা করা হয়।
তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই প্রকল্পের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি, অর্থাৎ বরাদ্দ শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন ভারত ২০২৪ সালে ইরানের চাবাহারের শহীদ বেহেশতি টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ১০ বছরের চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের ক্ষেত্রে এই বন্দর প্রকল্প ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের ওপর ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাপের কারণেই চাবাহার প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করা হয়েছে। বিশেষ করে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর এই চাপ আরও বেড়েছে।
এর ফলে চাবাহার প্রকল্পে ভারতের ভূমিকা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগ পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এদিকে বাজেট বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ভারতের সহায়তার সবচেয়ে বড় প্রাপক দেশ হিসেবে ভুটান তার অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটির জন্য বরাদ্দ প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৮৯ কোটি টাকায়। এই বরাদ্দ মূলত জলবিদ্যুৎ ও অবকাঠামো প্রকল্পে ভারতের ধারাবাহিক সহায়তার প্রতিফলন।
নেপালের জন্য বরাদ্দ ১৪ শতাংশ বেড়ে ৮০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। শ্রীলঙ্কার জন্য সহায়তা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০ কোটি টাকায়।
অন্যদিকে, মালদ্বীপের জন্য বরাদ্দ প্রায় ৮ শতাংশ কমিয়ে ৫৫০ কোটি টাকা করা হয়েছে। তবে মরিশাস একই পরিমাণ অর্থ ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে পেয়েছে বলে বাজেট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
সব মিলিয়ে ভারতের নতুন বাজেটে বাংলাদেশের সহায়তা কমানো এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য বরাদ্দ বাড়ানোয় দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক ও কূটনৈতিক সমীকরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র : জনকণ্ঠ













































