প্রচ্ছদ জাতীয় প্রধান উপদেষ্টার গভীর উদ্বেগ: কিন্তু কেন?

প্রধান উপদেষ্টার গভীর উদ্বেগ: কিন্তু কেন?

খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের ভয়াবহতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি এ সংক্রান্ত জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় করণীয়সমূহের একটি বিস্তারিত লিখিত কর্মপরিকল্পনা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জমা দিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

রোববার (৭ ডিসেম্বর) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় খাদ্যদূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি মোকাবিলা বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে সভাপতিত্ব করতে গিয়ে তিনি এ নির্দেশনা প্রদান করেন।

সভায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, খাদ্যে নানাবিধ দূষণের বিষয়টি আমরা দীর্ঘদিন ধরেই জানি। নিজেদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার স্বার্থে এ সংকট মোকাবিলায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাস্তবায়নযোগ্য দিকগুলো পর্যালোচনা করে জরুরি পদক্ষেপ তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হবে।

এ সময় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) খাদ্যদূষণ সংক্রান্ত বেশ কিছু উদ্বেগজনক তথ্য উপস্থাপন করে। তাদের মতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে প্রতি বছর খাদ্যবাহিত রোগে বিশ্বে ৬০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে বাংলাদেশে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। প্রতি ১০ জন শিশুর একজন বছরে অন্তত একবার খাদ্যবাহিত রোগে ভোগে এবং আক্রান্ত ৩ শতাংশ শিশুর মধ্যে ১ শতাংশ মারা যায়।

বিএফএসএর তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যে প্রধানত চার ধরনের দূষক থাকতে পারে ভারী ধাতু, কীটনাশক ও জীবনাশকের অবশিষ্টাংশ, জৈবদূষক এবং তেজস্ক্রিয় উপাদান। গত অর্থবছরে ১,৭১৩টি নমুনা পরীক্ষা এবং চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৮১৪টি নমুনা বিশ্লেষণে অতিরিক্ত মাত্রায় সিসা বা সিসা ক্রোমেট পাওয়া গেছে। পর্যালোচিত ১৮০টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে সিসা শনাক্ত হয়েছে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া জানান, ইউনিসেফের সমীক্ষায় প্রায় সাড়ে ৩ কোটি বাংলাদেশি শিশুর দেহে সিসার সংক্রমণ ধরা পড়েছে। সিসা মানবদেহে প্রবেশ করলে মস্তিষ্ক, যকৃত, কিডনি, হাড় ও দাঁতে জমা হয়। শিশুদের হাড় নরম থাকায় সিসা দ্রুত মস্তিষ্কে পৌঁছে তাদের মানসিক বিকাশ ব্যাহত করে। এছাড়া ৫ শতাংশ গর্ভবতী নারীর মধ্যেও সিসা সংক্রমণের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

এ ব্যাপারে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ১০ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যেখানে সিসা দূষণ হ্রাসে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা রয়েছে।

বৈঠকে কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা জানান, হাঁস-মুরগি, মাছ এবং দুগ্ধজাত পণ্যের মাধ্যমে মানবদেহে বেশ কিছু ক্ষতিকর উপাদান প্রবেশ করছে। বিশেষ করে পোল্ট্রি খাতে অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিষয়টি বড় উদ্বেগের কারণ। যদিও বড় ফার্মগুলো বেশ নিয়ন্ত্রিত, কিছু অনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান এখনো নজরদারির বাইরে থেকে অবৈধভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এসব ফার্মকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা এবং কৃষিতে অবৈধ কীটনাশক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও আলোচনা হয়।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেশে খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে গিয়ে এর নিরাপত্তাকে প্রায়শই উপেক্ষা করা হচ্ছে। তিনি জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যমের ভূমিকা বাড়ানো এবং পাঠ্যপুস্তকে খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান জানান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ল্যাবরেটরি ব্যবহারের মাধ্যমে সিসা দূষণ নিয়ে সমন্বিত গবেষণা দ্রুত শুরু করা উচিত।

বৈঠকে কৃষি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, স্বরাষ্ট্র, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র : কালবেলা