প্রচ্ছদ অপরাধ ও বিচার পাগল নয়, সিরিয়াল কিলার: ৬ খুনের নেপথ্যে বেরিয়ে এলো সব ভয়ংকর তথ্য

পাগল নয়, সিরিয়াল কিলার: ৬ খুনের নেপথ্যে বেরিয়ে এলো সব ভয়ংকর তথ্য

ঢাকার সাভারে একের পর এক ছয়টি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছে পুলিশ। ভবঘুরের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ানো মশিউর রহমান খান সম্রাট (৪০) নামের এক ব্যক্তি ঠান্ডা মাথায় বৃদ্ধা, নারী ও কিশোরীসহ ছয়জনকে হত্যা করেছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। পুলিশ বলছে, পাগলের মতো আচরণ করলেও তিনি মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন এবং পরিকল্পিতভাবেই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।

গ্রেপ্তার ও রিমান্ড আবেদন
রোববার (১৮ জানুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সাভার মডেল থানার সামনে থেকে সম্রাটকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে একটি মাফলার, দিয়াশলাই ও একটি মোবাইল ফোন জব্দ করেছে পুলিশ। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) তাকে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের চাঞ্চল্যকর তথ্য
সোমবার দুপুর ১২টায় সাভার থানা চত্বরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস অ্যান্ড ট্রাফিক উত্তর) আরাফাতুল ইসলাম বলেন,“সম্রাট পাগলের মতো আচরণ করলেও তিনি পাগল নন। তিনি সাইকো টাইপের একজন মানুষ, যিনি ঠান্ডা মাথায় ছয়টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।”

তিনি জানান, ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনের লাশ সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের ভেতর থেকে এবং একজনের লাশ সাভার মডেল মসজিদের সামনে থেকে উদ্ধার করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা
পুলিশের ভাষ্যমতে, সম্রাট প্রথম হত্যাকাণ্ড ঘটান ২০২৫ সালের ৪ জুলাই। সেদিন রাতে সাভার মডেল মসজিদের সামনে আসমা বেগম (৭৫) নামে এক বৃদ্ধাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
এরপর ধারাবাহিকভাবে—
২৯ আগস্ট: কমিউনিটি সেন্টারে এক যুবককে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দেওয়া
১১ অক্টোবর: একই ভবন থেকে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার
১৯ ডিসেম্বর: আরেক যুবকের আগুনে পোড়া লাশ উদ্ধার
১৮ জানুয়ারি: এক কিশোরী (১৩) ও এক যুবকসহ দুজনকে হত্যা করে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা

সব মিলিয়ে ছয়টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার কথা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন সম্রাট।

কমিউনিটি সেন্টারই ছিল হত্যার কেন্দ্র
সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারটি দীর্ঘদিন ধরে জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের মালিকানা জটিলতায় পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভবঘুরে সম্রাট সেখানে রাত কাটাতেন এবং একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটান বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সিসিটিভি ফুটেজেই ধরা পড়েন ঘাতক
পুলিশ জানায়, সর্বশেষ জোড়া মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়। তার চলাফেরা, সময় ও অবস্থান মিলিয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়। পরে স্থানীয় এক সাংবাদিকের ধারণ করা ভিডিওর সঙ্গে মিল পাওয়ায় তাকে আটক করা হয়।

ভবঘুরেদের টার্গেট করতেন সম্রাট
সাভার থানার পরিদর্শক (অপারেশন) হেলাল উদ্দিন বলেন, “কমিউনিটি সেন্টারে যাদের হত্যা করা হয়েছে, তারা সবাই ভবঘুরে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রোববার আরও এক ভবঘুরে নারীকে সেখানে দেখা গিয়েছিল, তাকেও হত্যার পরিকল্পনা ছিল বলে সম্রাট জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে।”

আরও হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা খতিয়ে দেখছে পুলিশ
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরাফাতুল ইসলাম বলেন, “রিমান্ড মঞ্জুর হলে ছয়টি হত্যাকাণ্ডের পেছনের উদ্দেশ্য, অন্য কেউ জড়িত আছে কি না এবং আরও কোনো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—সবকিছু খতিয়ে দেখা হবে।”

এলাকাবাসীর স্বস্তি, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি
পরপর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দীর্ঘদিন আতঙ্কে থাকা সাভারবাসী পুলিশের অভিযানে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। স্থানীয়দের দাবি, এই নৃশংস সিরিয়াল কিলারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “যাকে প্রতিদিন রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দেখতাম, সেই মানুষ যে এতগুলো খুন করেছে- ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।”