
কূটনৈতিক ‘ব্রোমান্স’ দিয়ে শুরু হলেও, সময়ের স্রোতে ফাটল ধরেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যকার সম্পর্কের দেয়ালে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উভয় নেতার মধ্যে উত্তেজনা, অভিযোগ, এবং কৌশলগত বিচ্যুতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে এই দ্বন্দ্ব কি তবে কট্টর ইসলাম বিদ্বেষী মোদীর জন্য কোনও ‘পতনের বার্তা’ বয়ে আনছে?
ইতিহাস কিন্তু, ঠিক তেমনটিই বলে। পুরো বিশ্বকে শাসন করা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সাথে সম্পর্ক খারাপ করলে তার খেসারত দিতে হয় পতনের মাধ্যমেই। এমন নজির বিশ্বের বুকে ভুরি ভুরি রয়েছে। আর সেখানে মোদি তো দুধের শিশু। ট্রাম্পের নিষেধ করা সত্ত্বেও চোখ রাঙানীর পরও মোদী দেখিয়েছে উদ্ধতপূর্ণ আচরণ। নিষেধাজ্ঞার পরও রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করা কোনভাবেই বন্ধ করেনি তার সরকার।
এই তো কদিন আগেও মোদী-ট্রাম্প জুটি ছিল বিশ্ব রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে মোদিকে আমন্ত্রণ করেছিলেন ট্রাম্প। তখন তাঁরা চকচকে চুম্বকাক্ত একটি ‘ব্রোমান্স’ প্রদর্শন করেছিলেন। একে অন্যজনকে ‘দারুণ বন্ধু’ আখ্যা দিয়েছিলেন, আর মোদি ব্যবহার করেছিলেন “মেইক ইন্ডিয়া গেট এগেইন”-এর প্রতিধ্বনি।
কিন্তু, সব কিছু যেনো ফিকে হয়ে দাঁড়িয়েছে মোদীর শিশুসুলভ বুদ্ধিহীন আচরণে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধ শুরু পর আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলো রাশিয়ার উপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কিন্তু ভারত রাশিয়ার থেকে তেল কেনা বন্ধ করেনি। আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো ভারতকে তেল কেনা বন্ধ করার জন্য চাপ দিচ্ছে। আর ট্রাম্পতো সরাসরিই নিষেধ করেছিলেন, হুংকার দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও ভারত বলছে, তারা তাদের দেশের স্বার্থের জন্য তেল কিনছে, দেশের নাগরিকদের জন্য কম দামে তেল কেনার চেষ্টা করছে।
ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মোদী তেল কেনা অব্যাহত রাখায়, ট্রাম্পও সম্প্রতি ভারতীয় পণ্যের উপর ৫০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছেন। যা পূর্বে নির্ধারিত ২৫% এর দ্বিগুণ। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, ভারত মার্কিন বাজারে ‘অন্যায্য সুবিধা’ নিচ্ছে। যদিও পাল্টা জবাবে নয়াদিল্লীও কড়া ভাষায় ট্রাম্পের পদক্ষেপকে ‘অবিচার’ আখ্যা দিয়েছে। এর পাশাপাশি, পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্পের প্রকাশ্য সৌহার্দ্য এবং কাশ্মীর ইস্যুতে ‘মধ্যস্থতার ইচ্ছা’ও ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের ক্ষুব্ধ করেছে। ট্রাম্প যেখানে বলছেন, তিনি মধ্যস্থতা করেছিলেন পাক-ভারত যুদ্ধ বন্ধে। সেখানে মোদী বারবার মিথ্যাচার করেছেন বিষয়টি নিয়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যেসব নেতা অতীতে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়নে জড়িয়েছেন, তাঁদের রাজনৈতিক স্থিতি টেকেনি। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়া একাধিক নেতার কূটনৈতিক ও আভ্যন্তরীণ চাপে পড়ার নজির রয়েছে। তাই মোদীর ক্ষেত্রেও অনেকেই সেই ‘পতনের ঘন্টা’ বাজতে দেখছেন। একে তো রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করেননি উল্টো আরও রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের পায়তারা চালাচ্ছে মোদী প্রশাসন।
এদিকে ট্রাম্প যে ইতিমধ্যে মোদীর পতনের ঘন্টা বাজাচ্ছে তা বোঝা যায়, পাকিস্তানের সাথে মোদী প্রশাসনের সাম্প্রতিক সম্পর্কে। কদিন পরপরই পাক সেনা প্রধানের আমেরিকা সফর, আবার সেখান থেকেই ভারতকে চোখ রাঙিয়ে দেওয়া হুঙ্কার যেনো মোদীর পতনই ডেকে আনছে। আবার যে জনগণের কথা বলে সস্তায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরও রাশিয়ার তেল কিনছে মোদীর সরকার সেই জনগণকেই মার্কিন অতিরিক্ত শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে বিভিন্ন খাতে। বিশেষ করে পোশাক, গহনা, ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে হায় হুতাশ অবস্থা ভারতীয়দের।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী চাইছেন আমেরিকাকে পাশ কাটিয়ে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পাকাপোক্ত করতে। কিন্তু, চীন যে ওদের চীর শত্রু। পাকিস্তানের পর ভারতীয় দাদাবাবুরা সবচেয়ে বেশি ভয় পান চাইনিজদের। তাই চায়নার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের যে দিবাস্বপ্ন মোদীর তা কখনোই বাস্তবে রূপ নিবে না বলাই যায়। উল্টো আমেরিকা, চীন ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত অঘোষিত ভারতকে মাল্টিপল শায়েস্তাকারীদল রেডী হচ্ছে পুরোদমে।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর অদূরদর্শিতায় মোদি-ট্রাম্প সম্পর্ক এখন এক অনিশ্চিত মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। যারা সবসময় পরস্পরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন, তাঁরাই আজ একে অপরের বিরুদ্ধে পরোক্ষ চাপ তৈরি করছেন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে, নরেন্দ্র মোদি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোন সুক্ষ্ম চালের শিকার হতে পারেন এমনটিই মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।
সূত্র: ইনকিলাব