
জাপানের আগাম জাতীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে এক্সিট পোল। রোববার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে তাকাইচির লিবারাল ডেমোক্রেটিক পার্টি নেতৃত্বাধীন জোট বড় জয়ের পথে রয়েছে। খবর বিবিসির।
লিবারাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্ব পাওয়ার মাত্র চার মাস পরই স্পষ্ট জনসমর্থন নিশ্চিত করতে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি। তার এই সাফল্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, কারণ তার আগের দুই প্রধানমন্ত্রীর সময় দুর্নীতি কেলেঙ্কারি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দলটি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় ধরেই জাপানে এলডিপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় রয়েছে। শক্তিশালী বিরোধী জোটের অভাব এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়। তবে তাকাইচি আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার দল যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তাহলে তিনি পদত্যাগ করবেন। সে কারণে এই নির্বাচনকে অনেকেই তার জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছিলেন।
২০২৪ সালে এলডিপি সংসদের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় এবং বহুদিনের শরিক কোমেইতো দলের সঙ্গে জোট ভেঙে যায়। তবে তাকাইচির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দলকে নতুন করে চাঙ্গা করেছে। তার সরকারের প্রতি জনসমর্থনের হার বেশিরভাগ সময়েই ৭০ শতাংশের ওপরে ছিল।
রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকের এক জরিপ অনুযায়ী, এলডিপি ও বর্তমান জোটসঙ্গী জাপান ইনোভেশন পার্টি মিলিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৬৫টি আসনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৬৬টি আসন পেতে পারে।
রোববার তীব্র শীত ও তুষারপাত উপেক্ষা করে ভোট দিতে বের হন জাপানের ভোটাররা। এটি ছিল ৩৬ বছরের মধ্যে দেশের প্রথম মধ্য-শীতকালীন নির্বাচন। পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে অন্তত ৩৭টি ট্রেনলাইন, ৫৮টি ফেরি রুট বন্ধ রাখা হয় এবং ৫৪টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। টোকিওতেও বিরল তুষারপাত দেখা যায়।
ভোটারদের মধ্যে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ স্পষ্ট ছিল। টোকিওর ভোটার রিতসুকো নিনোমিয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি না থাকায় মানুষ এখন হঠাৎ খরচ বাড়ায় আতঙ্কিত। তার মতে, স্বল্পমেয়াদি নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান জরুরি।
তাকাইচির প্রাণবন্ত প্রচারণা, ব্যয় বাড়ানো ও করছাড়ের প্রতিশ্রুতি এবং জাতীয়তাবাদী বক্তব্য ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার উপস্থিতি তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। দৈনন্দিন জীবন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিডিও শেয়ার করে তিনি নতুন অনুসারী গড়ে তুলেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের সঙ্গে ড্রাম বাজানোর একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে আগের তুলনায় এবার বিরোধীরা কিছুটা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এলডিপির সাবেক জোটসঙ্গী কোমেইতো দল সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক পার্টির সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রতিনিধি পরিষদে সবচেয়ে বড় বিরোধী ব্লক গঠন করেছে।
তাকাইচি অভিবাসন আইন কঠোর করা, বিদেশিদের দ্বারা জাপানি জমি মালিকানা পর্যালোচনা এবং বিদেশি নাগরিকদের কর ও স্বাস্থ্যবিমা বকেয়া আদায়ের ওপর জোর দিয়েছেন। তবে দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩ শতাংশ বিদেশি হওয়ায় সমালোচকদের অভিযোগ, এসব বক্তব্য সমাজে অযথা বিভাজন তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের একাংশ সন্দিহান, বাড়তি ব্যয় ও করছাড় দিয়ে স্থবির অর্থনীতি চাঙ্গা করা সম্ভব হবে কি না। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে জাপানের সরকারি ঋণের পরিমাণ ইতিমধ্যেই অন্যতম সর্বোচ্চ।
চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। গত নভেম্বরে তাকাইচি ইঙ্গিত দেন, চীন যদি তাইওয়ানে হামলা চালায়, জাপান সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে। জাপানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের ক্ষেত্রে এ মন্তব্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাকাইচির ঘনিষ্ঠতা নিয়েও আলোচনা চলছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাকাইচিকে সমর্থন জানিয়েছেন, যা একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে বিরল ঘটনা। উভয়েই জাপানের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে। ভোটারদের একাংশের কাছে প্রতিরক্ষা ও সামাজিক ব্যয়ের ভারসাম্য বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
ভোটার ইউকো সাকাই বলেন, প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তার মতে, জাতীয় নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের জীবনমান ; এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।










































