
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—আওয়ামী লীগের ভোট যাবে কোথায়? ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা, শাপলা, লাঙ্গল নাকি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দিকে ঝুঁকবে এই ভোট? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বহু আসনে আওয়ামী লীগের ভোট জয়-পরাজয়ের হিসাব পাল্টে দেওয়ার মতো বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। দেশের প্রায় সব সক্রিয় রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগকে গণহত্যার দায়ে নির্বাচনের বাইরে রাখার পক্ষে অবস্থান নিলেও, দলটির সমর্থকদের ভোট নিজেদের পক্ষে টানতে চায় প্রতিদ্বন্দ্বী সব দল। এ নিয়ে আসনভিত্তিক নীরব প্রতিযোগিতা চলছে।
আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের শক্তি বোঝার জন্য অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়—
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পায় ৩০.০৮ শতাংশ
১৯৯৬ সালের সপ্তম নির্বাচনে ৩৭.৪৪ শতাংশ
২০০১ সালের অষ্টম নির্বাচনে ৪০.১৩ শতাংশ
২০০৮ সালের নবম নির্বাচনে ৪৮.০৪ শতাংশ
এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচন ব্যাপক কারচুপি ও প্রশ্নবিদ্ধ বলে সমালোচিত হয়।
সমর্থন কমলেও প্রভাব রয়ে গেছে
তবে ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে। বিভিন্ন জরিপ বলছে, বর্তমানে আওয়ামী লীগের সমর্থক সংখ্যা ১৫ শতাংশের বেশি নয়। তবুও এই ১৫ শতাংশ ভোটার কিংবা নীরব সমর্থকেরা যদি ভোটকেন্দ্রে যান, তাহলে অনেক আসনেই প্রত্যাশিত ফলাফল বদলে যেতে পারে।
‘নো ভোট নো ভোট’ স্লোগান
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে ‘নো ভোট নো ভোট’—অর্থাৎ ‘নৌকা নেই তো ভোট নেই’—স্লোগান ছড়িয়ে পড়েছে। এটি যদি দলীয় সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তাহলে অনেক ভোটার ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন। তবে তৃণমূল পর্যায়ের সমর্থকেরা এই নির্দেশনা মানবেন কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
সংখ্যালঘু ভোটের গুরুত্ব
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮ থেকে ১০ শতাংশ ধর্মীয় সংখ্যালঘু। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, অতীতে তারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন। কিন্তু এবার বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলই এই ভোটব্যাংকের দিকে নজর দিচ্ছে। এই ভোটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের মুসলিম ভোটার যোগ হলে মোট হিসাবটি উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।
কোন পথে যেতে পারে আওয়ামী ভোট?
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, আওয়ামী লীগের ভোট কোন দিকে যাবে, তা কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে—
প্রথমত, দলটির আদর্শের কাছাকাছি কোনো প্রার্থী থাকলে তারা সেই প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট আসনে ভোটার ও প্রার্থীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তৃতীয়ত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রার্থী বা তাদের কর্মীরা আওয়ামী লীগের কর্মীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছে, সেটিও বিবেচনায় থাকবে।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হলে—যেমন ‘নো ভোট নো ভোট’—তাও বড় ভূমিকা রাখবে।
বিএনপির দিকে ঝোঁকার সম্ভাবনা
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে জামায়াত বরাবরই সোচ্চার ছিল। বিপরীতে, বিএনপি এই বিষয়ে বেশিরভাগ সময় নীরব ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পর বিএনপি তাতে সমর্থন জানায়।
বর্তমানে বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিএনপিতে যোগ দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ফলে আওয়ামী লীগের ভোট বিএনপির দিকে গেলে তা বিস্ময়ের কিছু হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপিকে তুলনামূলক সহনশীল দল হিসেবেও দেখা হয়। সে কারণে অনেক আওয়ামী ভোটার নিজেদের স্বার্থে ধানের শীষের পক্ষে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জামায়াত ও জাতীয় পার্টির হিসাব
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় এবং সরকার পতনের আগে দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়। জামায়াতকে সবসময় আওয়ামী-বিরোধী দল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সে কারণে নৌকার ভোট সরাসরি দাঁড়িপাল্লায় যাবে—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টিও আলোচনায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিল। আওয়ামী লীগ যদি লাঙ্গল প্রতীকের পক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে জাতীয় পার্টির আসন বাড়তে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় পার্টির সরকার গঠনের সম্ভাবনা কম থাকায় নৌকার সমর্থকদের মধ্যে দলটির প্রতি তেমন আগ্রহ নেই।
স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ‘রিফাইনড আওয়ামী লীগ’
আওয়ামী লীগের পতনের পর ‘পরিশুদ্ধ’ বা ‘রিফাইনড আওয়ামী লীগ’-এর ধারণা নিয়ে আলোচনা হলেও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। ধারণা করা হয়েছিল, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতারা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবেন। কিন্তু সেটিও খুব একটা হয়নি।
ফলে নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলো নিজেদের মতো করে আওয়ামী লীগের ভোটারদের টানার চেষ্টা করছে। এতে তারা সফল হলে একদিকে ভোটের হার বাড়বে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে।
মান্নার বিশ্লেষণ
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আওয়ামী লীগ যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে ভোট প্রয়োগ করে, তাহলে তা বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে। তবে তাঁর মতে, এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং বিচ্ছিন্নভাবে আওয়ামী সমর্থকেরা ভোট দিতে পারেন। এতে অল্প ব্যবধানে যেসব আসনে ফল নির্ধারিত হয়, সেখানে এই ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।











































