প্রচ্ছদ জাতীয় ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাসের সঙ্গে কী ঘটেছিল

ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাসের সঙ্গে কী ঘটেছিল

ময়মনসিংহের ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস (২৭) নামে এক পোশাক শ্রমিককে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি পোশাক কারখানায় পকেট গেট দিয়ে বের হচ্ছে কয়েক’শ শ্রমিক। সেখানে একজন শ্রমিককে মারতে মারতে মূল সড়কের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে হত্যার করে তার মরদেহ একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

দিপু চন্দ্র দাসকে কেন এভাবে হত্যা করা হলো। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দিপুর পরিবার, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য।

ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাসের সঙ্গে কী ঘটেছিল

দিপুর বিরুদ্ধে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তার কোনও সত্যতা পায়নি পুলিশ। তবে যে পোশাক কারখানায় দিপু কাজ করতেন সেখানে সহকর্মীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে হত্যার শিকার হতে পারেন বলে জানিয়েছে পরিবার ও স্থানীয়রা।

পরিবারের ভাষ্য, এটি হঠাৎ কোনও উত্তেজিত জনতার ঘটনা নয়। পরিকল্পিতভাবে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তৈরি করে দিপুকে হত্যা করা হয়েছে।

নিহত দিপুর ভাই অপু রবি দাস বলেন, দিপু ফ্লোর ম্যানেজার থেকে সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োগ পরীক্ষা দিয়েছিল। ঘটনার দিন বিকালে পদ-পদবি নিয়ে দিপুর সঙ্গে অফিসের বেশ কয়েকজন সহকর্মীর ঝামেলা হয়। ওই দিন তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে মারতে মারতে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়। পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়েও আমার ভাই রক্ষা পায়নি।

তিনি বলেন, ঘটনার দিন আমার ভাইয়ের বন্ধু হিমেল ভাই আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, তোমার ভাই মহানবীকে (সা.) নিয়ে খারাপ কথা বলায় তাকে থানায় দেওয়া হয়েছে। এ কথা শুনে আমি দৌড়ে বাসা থেকে বের হই। একটু পর আবার ফোন করে জানায়- সে মারা গেছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি ভাইয়ের লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে অপু বলেন, ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। তার কোনও অপরাধ থাকলে পুলিশে দিতে পারতো। এতো নির্মমভাবে মানুষ মানুষকে মারে?

তিনি বলেন, কারখানার লোকরা চাইলে ভাইকে বাঁচাতে পারতো। তাদের গাফলতির কারণে ভাইয়ের এই পরিণতি। সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে ভাই হত্যার বিচার চাই।

স্থানীয় মেম্বার (৫ নং ওয়ার্ড) তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, এটা ধর্ম নিয়ে কটূক্তির কোনও ঘটনা নয়। শুনেছি, উৎপাদন বাড়ানো, ওভারটাইম, কাজের পরিবেশ ও শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়। এ কারণেই তাকে দীর্ঘদিন পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। একপর্যায়ে কারখানা থেকে বের করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। পরে মব চালিয়ে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, কারাখানা থেকে এক কিলোমিটার রাস্তায় তাকে পেটানো হয়। এরপর লাশ গাছে বেঁধে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এই হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।

জানতে চাইলে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ধর্ম অবমাননার তথ্য পেলেও সবই মুখে শোনা। ধর্ম নিয়ে কটূক্তির যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত কোনও সত্যতা পুলিশ এখনও পায়নি।

তিনি বলেন, মব সৃষ্টি করে হত্যা, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। কেন ওই যুবককে পুলিশের হাতে না দিয়ে জনতার হাতে তুলে দেওয়া হলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া কারখানায় কোনও দ্বন্দ্ব রয়েছে কিনা সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও বলেন, ভিডিও ফুটেজ দেখে ইতোমধ্যে র‍্যাব ও পুলিশ ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বাকিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহের ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, দিপুকে অন্য কারণে হত্যা করা হয়েছে। দিপু ধর্ম নিয়ে কটূক্তির করেছে এমন কোনও প্রমাণ মেলেনি।

সম্প্রতি এ ঘটনায় ৭ জনকে গ্রেফতারের পর একটি সংবাদ সম্মেলন করে র‌্যাব। ময়মনসিংহ র‌্যাবের কোম্পানি কমান্ডার মো. সামসুজ্জামান জানান, এ ঘটনায় ‘ধর্ম অবমাননার’ কোনও প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নিহত ব্যক্তি যদি ফেসবুকে কিছু লিখতেন তাহলেও একটা বিষয় হতো। সেখানে সবাই এখন বলছেন তারা তাকে (নিহত শ্রমিক) এমন কিছু বলতে নিজেরা শোনেননি। কেউ নিজে শুনেছেন বা দেখেছেন (ধর্ম অবমাননার বিষয়ে) এমন কাউকে পাওয়া যায়নি।

গ্রেফতার ১২

হত্যাকাণ্ডর পর এখন পর্যন্ত র‌্যাব ও পুলিশের অভিযানে ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ২১ ডিসেম্বর সকালে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন গ্রেফতারের ‍বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এ ঘটনায় র‌্যাব ও পুলিশ এ পযন্ত ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- আশিকুর রহমান (২৫), কাইয়ুম (২৫), মো. লিমন সরকার (১৯), মো. তারেক হোসেন (১৯), মো. মানিক মিয়া (২০), এরশাদ আলী (৩৯), নিজুম উদ্দিন (২০), আলমগীর হোসেন (৩৮), মো. মিরাজ হোসেন আকন (৪৬), মো. আজমল হাসান সগীর (২৬), মো. শাহিন মিয়া (১৯) ও মো. নাজমুল।

গত ১৮ ডিসেম্বর রাত ৯টার দিকে ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে পোশাক কারখানার শ্রমিক দিপুকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় কারখানার সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের জামিরদিয়া ডুবালিয়াপাড়া এলাকায় লোকজন বিক্ষোভ করে তার লাশে আগুন ধরিয়ে দেন। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখান থেকে মরদেহ উদ্ধার করেন।

নিহত দিপু জামিরদিয়া ডুবালিয়াপাড়া এলাকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেডের কারখানার শ্রমিক ছিলেন। তিনি তারাকান্দা উপজেলার বানিহালা ইউনিয়নের মোকামিয়াকান্দা গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে। এ ঘটনায় তার ভাই বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ১৫০ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এ ঘটনা প্রসঙ্গে ১৯ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ময়মনসিংহে এক হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আমরা গভীরভাবে নিন্দা জানাই। নতুন বাংলাদেশে এ ধরনের সহিংসতার কোনও স্থান নেই। এই নৃশংস অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন