
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যখন নতুন নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে, তখন নির্বাচনকে ঘিরে নানা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, দীর্ঘ সময় রক্ত ও জীবন দেওয়ার বিনিময়ে আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ পেয়েছিলাম। ফ্যাসিবাদের শুধু পতনই হয়নি, তাদের নেতারাও দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।
রোববার (৩১ আগস্ট) প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমন্ত্রণে যমুনায় বৈঠক শেষে একথা বলেন জামায়াতের নায়েবে আমির সাবেক এমপি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের।
তিনি বলেন, জাতি আশা করেছিল স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একটি গুণগত পরিবর্তন আসবে। সেই প্রত্যাশায় এখনও অনেক ঘাটতি রয়েছে।
ডা. তাহের বলেন, জাতির স্বপ্ন ছিল—একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজও অনেকখানি অপূর্ণ। নির্বাচন সামনে রেখে এখন দেশের বিরুদ্ধে এবং নির্বাচনকে বানচাল করার জন্য গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে হচ্ছে, এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করতে হলে সবার আগে দরকার অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন।
আওয়ামী লীগের মতো জাতীয় পার্টিকেও নিষিদ্ধ চায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, জাতীয় পার্টির ব্যাপারে সুস্পষ্ট করে বলেছি, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের কার্যক্রম যেভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তেমনিভাবে জাতীয় পার্টিকেও নিষিদ্ধ করা যেতে পারে।
তাহের বলেন, একটা নীলনকশার নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি কিনা, এমন প্রশ্ন উঠেছে। লন্ডনে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা। সরকারের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। পরিকল্পিত নির্বাচন হলে গণতন্ত্রকামী মানুষদের পক্ষে নির্বাচনে অংশ নেয়া সংকুচিত হয়ে যাবে।
নির্বাচনের তারিখের ব্যাপারে দ্বিমত নেই, দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই জানিয়ে তিনি বলেন, তবে নির্বাচনের কার্যকারিতার ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেছি।
ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করা ৩১টি দলের মধ্যে ২৫টি দল পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন চায় জানিয়ে তিনি বলেন, কেউ শুধু উচ্চকক্ষে চায়, জামায়াতসহ অনেকে উভয়কক্ষে পিআর চায়। কেন্দ্র দখল ঠেকাতে এই নতুন পদ্ধতিতে নির্বাচন জরুরি। মেজরিটিকে অবজ্ঞা করে কারো চাপে নির্বাচনে গেলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আমাদের জন্য নির্বাচনে যাওয়া সংকুচিত হয়ে যাবে।
দুয়েকটি দল জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে অভিযোগ করে তাহের বলেন, প্রধান উপদেষ্টার কাছে আইনি ভিত্তির দাবি জানিয়েছে জামায়াত। জুলাই সনদের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। বাস্তবায়ন না হলে জুলাই শহীদদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।
এই সরকার দখলদারদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি জানিয়ে তিনি বলেন, আগে এক গ্রুপ বাসস্ট্যান্ড দখলে নিয়েছে। এখন আরেক গ্রুপ নিয়েছে। এই সরকার কীভাবে নির্বাচন করবে, তা নিয়ে শঙ্কিত, কিছুটা উদ্বিগ্ন। মনে হচ্ছে, সরকার হাত পা ছেড়ে দিয়েছে। সরকারকে এখন আরও কঠোর হতে হবে। এখনো এর থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব।
জুলাই সনদ নিয়ে একটি দলই বাধা দিচ্ছে উল্লেখ করে তাহের বলেন, জুলাই সনদ, পিআর নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়া উচিত। তারা গণভোটে সিদ্ধান্ত নেবে। সরকারের উচিৎ স্টেকদের সাথে আলাপ আলোচনা করে নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের মধ্যে আলোচনা করা উচিৎ।
নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনায় দোষীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, নুরের ওপর হামলার ষড়যন্ত্র গভীরে। সবার বিচার হতে হবে।
আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে জাতীয় পার্টি কাজ করেছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ব্যপারে যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, জাতীয় পার্টির ব্যাপারেও একই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বৈঠকে ফ্যাসিবাদের দালালদের প্রশাসন থেকে সরানোর দাবি জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
এর আগে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও সমসাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করতে বিকেল সোয়া ৪টার দিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে প্রবেশ করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর চার সদস্যের প্রতিনিধি দল।
দলটির নায়েবে আমির সাবেক এমপি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহেরের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেন— দলের সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও ড. হামিদুর রহমান আযাদ (সাবেক এমপি)।