প্রচ্ছদ জাতীয় দুকূল হারালেন অলি, প্রায় ৫০ বছরের রাজত্বের অবসান

দুকূল হারালেন অলি, প্রায় ৫০ বছরের রাজত্বের অবসান

চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ছাতা প্রতীকের প্রার্থী ওমর ফারুক পরাজিত হয়েছেন। আসনটি অলি আহমদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ওমর ফারুক এলডিপির সভাপতি অলি আহমদের ছেলে।

আসনটিতে পরাজিত হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব) অলি আহমদের ‘পতন’ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আসনটিতে ১১ দলীয় জোটের শরিক লিবারেল- এলডিপির ছাতা প্রতীকের প্রার্থীকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী জসিম উদ্দীন আহমেদ।

চট্টগ্রামে ১৬টি আসনের মধ্যে কর্নেল অলির আসন হিসেবে পরিচিত ছিল চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনটি। এই আসনে দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে ‘শাসন’ করেছেন অলি।

একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়েও স্বাধীনতাবিরোধী দলের নেতৃত্বাধীন জোটে যাওয়া এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে ‘টাকার কুমির’ হিসেবে পরিচিত জসিম উদ্দীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার কারণেই তার ছেলের হার হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। একইসঙ্গে এই আসনে মিজানুল হক চৌধুরী নামে বিএনপির এক বিদ্রোহী প্রার্থীও ছিল। এই বিদ্রোহী প্রার্থীও অলির ছেলের পরাজয়ের আরেকটি কারণ।

সবমিলিয়ে কর্নেল অলি ৮৭ বছর বয়সে এসে একূল-ও কূল দুই কূলই হারিয়েছেন। একই সঙ্গে চন্দনাইশে অলি নিজের হাতে ছেলেকে ‘বলি’ দিলেন বলে মন্তব্য করেছেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা।

এ আসনে মোট ভোটার ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫১৩ জন। প্রার্থী ছিলেন ৮ জন।

ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, জসিম উদ্দীন আহমেদ পেয়েছেন ৭৬ হাজার ৪৯৩ ভোট। ওমর ফারুক পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৪৬৭ ভোট। ভোটের ব্যবধান মাত্র ১ হাজার ২৬।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের আলোচিত এ আসনে অলি আহমদ ১৯৮১ সাল থেকে ৬ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের প্রথম মেয়াদে ছিলেন যোগাযোগ মন্ত্রী। আর সেই সময়েই তিনি চন্দনাইশে অভূতপূর্ব অবকাঠামো উন্নয়ন করেছেন। যার প্রতিদান হিসেবে চন্দনাইশের মানুষ দল-মত নির্বিশেষে বার বার তাকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছেন।

বিএনপি থেকে বের হয়ে এলডিপি গঠন করে সেই দল থেকেও সংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৬ সালে বিএনপি থেকে বেরিয়ে তিনি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) প্রতিষ্ঠা করে ছাতা প্রতীকে নির্বাচন করেন। তবে ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচনে তার আসনটি একপ্রকার কেড়ে নেন আওয়ামী লীগের নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ২ যুগ পর বিএনপির দুর্গ হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রাম-১৪ চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক সংসদীয় আসনটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলো বিএনপি।

আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী আলোচিত-সমালোচিত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও ব্যবসায়ী জসিম উদ্দীন আহমেদকে দলে টেনে বিএনপি চমক সৃষ্টি করে। আর জসিম উদ্দিন অলির ছেলেকে হারিয়ে সৃষ্টি করেন আরেক চমক।

নির্বাচনি প্রচারণায় কর্নেল অলি ও জসিম উদ্দীন আহমেদ একে অপরের বিরুদ্ধে নানা বিষোদগারে ব্যস্ত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত অলিকেই হারতে হয়েছে জসিমের কাছে।

এলাকাবাসী জানান, নানা কারণে আসনটিতে এলডিপির ভরাডুবি হয়েছে। অলি আহমদ সারা জীবন জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতা করেছেন। গাল-মন্দ করেছেন। শেষ বয়সে এসে তিনি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে গেছেন; যা ভোটাররা ভালোভাবে নেয়নি।

আবার কর্নেল অলি বিএনপির সঙ্গে বেইমানি করেছেন, আবার বিএনপির বিরুদ্ধে নানান কথাবার্তা বলেছেন, ইতিহাস বিকৃতি করার চেষ্টা করেছেন, স্বাধীনতার ‘ঘোষক’ কিংবা জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে তিনি নিজেই উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং হাত ধরে নিয়ে এসেছেন- এমন কথা বলেও আলোচনা-সমালোচনার পাত্র হন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৫০ বছর ধরে যে জামায়াতের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন শেষ বয়সে এসে সেই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে গেছেন- এ বিষয়টিকে সাধারণ মানুষ গ্রহণ করেননি।

১৯৮১ সালে উপনির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এমপি নির্বাচিত হন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। ১৯৮৬ সালে ৭ মে তৃতীয় সংসদ, ১৯৮৮ সালে ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন তিনি জাতীয় পার্টির ইঞ্জিনিয়ার আফসার উদ্দিন আহমেদকে পরাজিত করেন।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৫ম জাতীয় সংসদ, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ, একই বছর ১২ জুন ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে কর্নেল অলি জয়লাভ করেন। ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসন ছাড়াও সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসন থেকেও নির্বাচন করেন। নির্বাচনে তিনি দুটি আসনে বিজয়ী হন।

এরপর তিনি চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনটি ছেড়ে দেন। পরে উপ-নির্বাচনে তাঁর সহধর্মিণী মমতাজ অলি আওয়ামী লীগের প্রার্থী নজরুল ইসলাম চৌধুরীকে পরাজিত করে জয়লাভ করেন।

২০০১ সালের ১ অক্টোবর ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় কর্নেল অলি নির্বাচিত হন। একই মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর শেষ দিকে কর্নেল অলি বিএনপি থেকে বেরিয়ে যান। ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) প্রতিষ্ঠা করেন।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এলডিপি থেকেও ‘ছাতা’ প্রতীক নিয়ে জয়লাভ করে ষষ্ঠবারের মতো জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার নিজের আসনটি উত্তরসূরি হিসেবে ছেলের হাতে তুলে দেওয়ার মানসে নিজে নির্বাচন না করে ছেলেকে প্রার্থী করেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট থেকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অলির নিজের হাতেই ছেলেকে ‘বলি’ দিলেন চন্দনাইশে। বয়স বিবেচনায় আগামী ৪-৫ বছর পর তার আর নির্বাচন করার সক্ষমতা নাও থাকতে পারে। তাই চন্দনাইশে অলির সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।