
ঢাকার ব্যস্ত সড়ক আর টার্মিনালগুলো যেন হঠাৎ করেই রঙিন এক জনস্রোতে ভরে উঠেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজধানী ছাড়ছেন লাখ লাখ মানুষ। যাত্রাপথে তৈরি হয়েছে ভোটের এক নয়া উৎসব। সায়েদাবাদ, গাবতলী, কমলাপুর ও সদরঘাট এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, দল বেঁধে যাত্রারত অনেকেই গাড়িতে ওঠার আগে ও পথে পথে দাঁড়িপাল্লার স্লোগান দিচ্ছেন। কেউ হাতে ব্যানার, কেউ মোবাইলে ছবি তুলছেন, এক সুরে এক কণ্ঠে দাঁড়িপাল্লার বিজয় বলে বিজয় চিহ্ন তুলছেন। ক্লান্তির মাঝেও স্পষ্ট রাজনৈতিক উচ্ছ্বাস ছিলো চোখে পড়ার মতো।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে দুপুরের পর থেকেই যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে। হাতে ব্যাগ, কাঁধে ঝোলা, কেউবা শিশু কোলে—দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে বাসে ওঠার অপেক্ষা করছেন। অনেকেই দল বেঁধে যাচ্ছেন। মাঝেমধ্যে শোনা যাচ্ছে নির্বাচনী স্লোগান, আবার কেউ কেউ গান গেয়ে, হেসে-খেলে যাত্রার ক্লান্তি ভুলে থাকার চেষ্টা করছেন। পরিবহন কাউন্টারগুলোর সামনে বাড়তি চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
সায়দাবাদ স্টার লাইন কাউন্টারে কথা হয় আবিদ আজম নামের এক ব্যাংকারের সাথে। তিনি বলেন, হাসিনা যুগে তিনটি সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারিনি। তাই এবার পরিবারকে নিয়ে ভোট দিতে যাচ্ছি। সদর আসনের এই ভোটার জামায়াত জোট সমর্থিত প্রার্থী ঈগল প্রতীক মজিবুর রহমান মঞ্জুকে ভোট দেবেন বলেও জানান।
। গাবতলী বাস টার্মিনালেও একই চিত্র। উত্তরবঙ্গগামী বাসগুলোর সামনে ছিল সবচেয়ে বেশি ভিড়। কয়েকজন তরুণ যাত্রী বলছিলেন, “ভোটও দেব, আবার গ্রামের বাড়িতে একসাথে আড্ডাও হবে—এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ। অতীতে ছুটি নিয়ে বাড়িতে গেলে আওয়ামী ক্যাডারদের হামলার আশঙ্কা থাকতো। এবার নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরার সাথে উৎসব নিয়ে ভোট দিতে পারব।
ভিড়ের কারণে টিকিট সংগ্রহ ও বাসে ওঠা নিয়ে কিছুটা ধাক্কাধাক্কি হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে সন্তুষ্ট বলেও জানান এই ভোটার
কমলাপুর রেলস্টেশন যেন ছিল আরেক রকম উচ্ছ্বাসের কেন্দ্র। ট্রেন ছাড়ার অনেক আগেই প্ল্যাটফর্ম ভরে যায় যাত্রীতে। কেউ মেঝেতে বসে আছেন, কেউ পত্রিকা বিছিয়ে পরিবার নিয়ে অপেক্ষা করছেন। ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের মধ্যে নড়াচড়া শুরু হয়, আর ট্রেন ঢুকতেই হুড়োহুড়ি পড়ে যায় উঠার জন্য। তবুও বেশিরভাগ মানুষের মুখে ছিল হাসি। ইয়াছিনা নামের এক যাত্রী লেন, “অনেক দিন পর সবাই একসাথে বাড়ি যাচ্ছি। নির্বাচন একটা উপলক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশা করছি এবার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবো”
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে নদীপথের যাত্রীদের মধ্যেও ছিল উৎসবের আমেজ। বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলগামী লঞ্চগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। লঞ্চে ওঠার সময় অনেকেই দাঁড়িপাল্লার স্লোগান দিচ্ছিলেন, কেউ জাতীয় পতাকা হাতে ছবি তুলছিলেন।
তবে এই আনন্দযাত্রার মাঝেও ছিল কিছু ভোগান্তি। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ, টিকিটের দালালচক্রের তৎপরতা এবং সময়সূচি নিয়ে বিভ্রান্তি—এসব অভিযোগও করেছেন অনেকে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের চলাচলে কিছুটা কষ্ট পোহাতে দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে রাজধানীর প্রধান টার্মিনালগুলোতে এখন এক অনন্য দৃশ্য—ভোটের দায়িত্ব আর পরিবারের টানে ঘরমুখো মানুষের ঢল। নির্বাচনের এই সময়টা তাই শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক দিক থেকেও যেন এক বড় মিলনমেলা হয়ে উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, ভোট দিতে যারা বাড়ি ফিরছেন তাদের সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হচ্ছে। অভিযোগের জন্য হটলাইনও চালু রয়েছে।









































