
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর এক ‘নতুন’ তারেক রহমান বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যিনি দীর্ঘদিন ধরে ‘বিতর্কিত’, ‘সমালোচিত’ এবং ‘হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক’ একটি অপবাদ বহন করে এসেছেন, ১৭ বছর পর দেশে ফিরে তিনি যেন হাজির হয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রাজনৈতিক অবয়বে।
প্রতিহিংসার বদলে সংলাপ, প্রতিপক্ষতার বদলে ঐকমত্য এবং ক্ষমতা প্রদর্শনের বদলে সংযম- তার এই নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই রূপান্তরের নেপথ্যে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে লন্ডনে দীর্ঘ নির্বাসিত সময়ে গড়ে ওঠা তারেক রহমানের একটি নতুন বলয়, যা ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা, আচরণ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরনকেই বদলে দিয়েছে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয় ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত ‘এক এগারো’ হিসেবে পরিচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। সে সময় তাকে ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একাধিক মামলা। গ্রেফতারের পর তাকে রিমান্ডে নিয়ে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে- এমন অভিযোগ তোলে তার পরিবার এবং দল।
তাদের দাবি অনুযায়ী, সে সময় তার মেরুদণ্ড গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দেয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ২০০৮ সালে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক সমঝোতার প্রেক্ষাপটে তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। সে সময় ‘আর রাজনীতি করবেন না’- এমন একটি অঘোষিত মুচলেকার কথা আলোচনায় এলেও বিএনপি বরাবরই এই দাবি অস্বীকার করে একে রাজনৈতিক অপপ্রচার হিসেবে আখ্যা দিয়ে এসেছে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় তারেক রহমানের নাম সম্পূরক অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালে এই মামলায় তাকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। একই সময়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব মামলার একাধিকটিতে যথাযথ তথ্য-প্রমাণের ঘাটতির প্রশ্ন উঠলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রেক্ষাপটে তাকে পলাতক দেখিয়ে বিচারকার্য সম্পন্ন করা হয়েছিল। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনে সশরীরে দেশে উপস্থিত থাকতে না পারলেও ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে তারেক রহমান এ সময় দলের নেতৃত্ব ধরে রাখেন এবং দমন-পীড়নের মধ্যেও দলীয় কাঠামো ও আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিলেন।
নির্বাসিত জীবনে তারেক রহমানকে শুধু রাজনৈতিক লড়াইই নয়, মোকাবিলা করতে হয়েছে একের পর এক ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিও।
দেশে থাকা তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ওপর চলতে থাকে চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। ২০১০ সালে ক্যান্টনমেন্টের ৬ নম্বর শহীদ মইনুল রোডের স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন থেকে তাকে উচ্ছেদ করা হয়। সেদিন স্বামীর স্মৃতিঘেরা ওই বাড়ি থেকে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে এক কাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল- যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীরভাবে দাগ কেটে থাকা এক কালো অধ্যায় বলে মনে করেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে উচ্ছেদ করা ছিল চরম অমানবিক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ সিদ্ধান্ত।
এর পরপরই বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাসহ একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়, যা বিএনপির ভাষায় ছিল রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিরোধী নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।
২০১৫ সালে তারেক রহমান হারান তার একমাত্র ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কোকোর মৃত্যু হয়। আরাফাত রহমান কোকোকেও ২০০৮ সালে উন্নত চিকিৎসার অজুহাতে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল বলে বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। দীর্ঘ নির্বাসনে থাকার কারণে তারেক রহমান একমাত্র ভাইকে শেষ দেখাটুকুও দেখতে পারেননি, যা তার ব্যক্তিগত জীবনের এক গভীর বেদনাবিধুর অধ্যায়।
এর তিন বছর পর, ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলে দলীয় সিদ্ধান্তে তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সে সময় পুরোনো ঢাকার কারাগারের স্যাঁতসেঁতে কক্ষে পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে অসুস্থ অবস্থায় বন্দিজীবন কাটাচ্ছিলেন তার মা। আর সেই মুহূর্তে প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার দূরে থেকে তারেক রহমান ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে দলকে সংঘবদ্ধ ও সক্রিয় রাখার জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান।
সে সময় দলের জ্যেষ্ঠ নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ নিয়মিত গায়েবি মামলা, গ্রেপ্তার ও গুমের শিকার হচ্ছিলেন। রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া তো দূরের কথা, পল্টনের দলীয় কার্যালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণভাবে দাঁড়ালেও অনেক নেতাকর্মীকে টেনেহিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানে তুলে নেওয়া হয়েছে- এমন অভিযোগ ছিল নিত্যদিনের। বছরের পর বছর থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের অসংখ্য নেতাকর্মী এসব মামলার ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হন। নিজ নিজ এলাকায় দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ফিরতে পারেননি হাজার হাজার বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থক। গুমের শিকার হয়ে আর ফিরে আসেননি চৌধুরী আলম, ইলিয়াস আলী কিংবা সাজেদুল ইসলাম সুমনের মতো বিএনপি নেতারা। তারা আজ বেঁচে আছেন কি না- এ প্রশ্নের উত্তর এখনো তাদের পরিবারের কাছে অজানা। তারা মৃত কি না, কিংবা মৃত্যু হলে তাদের মরদেহের পরিণতি কী হয়েছে, দাফন হয়েছিল কি না- এই ন্যূনতম তথ্যটুকুও কোনো পরিবার আজও জানতে পারেনি।
গত ৪ জানুয়ারি ২০২৬ অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেওয়া গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ বাস্তবতার একটি স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘গুম’ হিসেবে বিবেচিত হয়, যার মধ্যে ২৮৭টি মামলা ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ছিল বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে ২২ শতাংশ বিএনপির নেতাকর্মীরা ফিরে এলেও ৬৮ শতাংশ আজও নিখোঁজ রয়েছেন। এই দুঃসহ ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতির মধ্যেই স্কাইপ, জুম ও টেলিগ্রামের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দলের কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিটি স্তরের নেতাকর্মীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রেখে দলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে ভূমিকা রাখেন তারেক রহমান।
দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তারেক রহমান লন্ডনের একটি ছোট্ট ঘরের টেবিল-চেয়ারে বসেই দলীয় নেতাকর্মী ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিয়ে এসেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাকে ‘পলাতক আসামি’ আখ্যা দিয়ে দীর্ঘদিন তার বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ফলে দেশের মানুষ একটি বৃহৎ ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবুও প্রতিকূলতার কাছে নতি স্বীকার না করে তিনি সার্বক্ষণিকভাবে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।
একদিকে দূর প্রবাস থেকে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা, অন্যদিকে দেশে থাকা মায়ের কারাভোগ ও অসুস্থতা- দুটি বাস্তবতার মধ্যেই চলেছে তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবন। উন্নত চিকিৎসার অভাবে কারাগারে নিঃসঙ্গভাবে অসুস্থ অবস্থায় দিন কাটাতে থাকা বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে পরিবারের পক্ষ থেকে একের পর এক আবেদন জানানো হলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, প্রায় ২৭বার আবেদন করা হলেও ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে সম্মতি দেননি। বরং পালিয়ে যাওয়ার আগের বছর খালেদা জিয়াকে নিয়ে শেখ হাসিনা মন্তব্য করেছিলেন- “রোজই শুনি এই মরে মরে, এই যায় যায়। বয়স তো আশির ওপরে। এমনিই তো সময় হয়ে গেছে। তার মধ্যে আবার অসুস্থ। এখানে এত কান্নাকাটি করে তো লাভ নাই।”
৫ আগস্ট ২০২৪-এ সেই শেখ হাসিনাকেই শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালিয়ে পাশের দেশ ভারতে আশ্রয় নিতে হয়। তবে তার বিদায়ের পরও তারেক রহমান কিংবা বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে পতিত শাসককে নিয়ে কোনো কুরুচিপূর্ণ বা অশোভন মন্তব্য করা হয়নি। বরং ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সময়ে তারেক রহমান ধারাবাহিকভাবে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে সম্মিলিতভাবে কাজ করার কথা বলেন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। দীর্ঘ ১৬ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে নির্বাসনে থাকতে হলেও সরকার পতনের পরও তিনি কেন দেশে ফিরছেন না- এ নিয়ে সর্বমহলে প্রশ্ন ও কৌতূহল দেখা দেয়। তবে বিএনপির শীর্ষ নেতারা বরাবরই আশ্বস্ত করে আসছিলেন যে, তারেক রহমান দেশে ফিরবেন, তিনি ফিরবেন বৈধ উপায়ে এবং উপযুক্ত সময়েই।
কেবল মামলাজটই তারেক রহমানের দেশে ফেরার পথে একমাত্র বাধা ছিল না। দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের পরও ধারাবাহিক অপপ্রচার চলতে থাকে। এসব কারণে দেশে ফেরার পর তার নিরাপত্তা নিয়েও সংশয় ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার নামে থাকা মামলাগুলো থেকে একে একে তিনি অব্যাহতি পান। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করা হয় এবং ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল প্রকাশিত হয়। সব অনিশ্চয়তা ও জল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেখ হাসিনা দেশত্যাগের প্রায় ১৭ মাস পর অবশেষে গত ২৫ ডিসেম্বর রাজসিকভাবে দেশে ফেরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
দূর থেকে যারা এতদিন ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে তারেক রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেছেন, তারা এবং পুরো দেশবাসী যেন এক নতুন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করেন। দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে নেমেই তিনি খালি পায়ে দেশের মাটিতে পা রাখেন, ১৭ বছর পর হাতে নিয়ে ছুঁয়ে দেখেন দেশের মাটি! তার জন্য প্রস্তুত রাখা বুলেটপ্রুফ জিপ উপেক্ষা করে তিনি ওঠেন জাতীয় পতাকার আদলে লাল-সবুজ রঙের একটি বুলেটপ্রুফ বাসে। অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় তাকে বিমানবন্দর থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তার মা, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করছিলেন।
মুমূর্ষু মাকে দেখতে যাওয়ার পথে রাজধানীর পূর্বাচল সংলগ্ন জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে তিনি থামেন। মায়ের প্রতি গভীর উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সারা দেশ থেকে তাকে সংবর্ধনা দিতে আসা লক্ষ মানুষের অপেক্ষাকে তিনি উপেক্ষা করেননি। জনস্রোতে দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিটের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি বলেন- “আজ এই বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনাদের সবার সামনে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন সদস্য হিসেবে আপনাদের সামনে আমি বলতে চাই- ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান, ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি (দেশের মানুষের জন্য, দেশের জন্য আমার একটি পরিকল্পনা আছে)। এই পরিকল্পনা দেশের মানুষের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেদিন তারেক রহমানকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে নয়, বরং দেশের এক সংকটকালে দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসা একজন নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবেই বেশি প্রতিভাত হয়েছে। তাদের মতে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতির কল্যাণে যেন তিনি ব্যক্তিগত ঝুঁকি উপেক্ষা করে সামনে এসেছেন। সেই বক্তব্যে তারেক রহমান বারবার শান্তি ও সংযমের কথা বলেছেন, যার ঘাটতি বর্তমান সময়ে দেশের প্রতিটি মানুষ গভীরভাবে অনুভব করছে। গণসংবর্ধনার জন্য প্রস্তুত মঞ্চেও তিনি তার জন্য নির্ধারিত বিশেষ চেয়ারে বসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে একটি সাধারণ চেয়ার বেছে নেন, যা তার নতুন রাজনৈতিক ভঙ্গির প্রতীক হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
কিন্তু তারেক রহমানের ২৫ ডিসেম্বরের এই রাজসিক প্রত্যাবর্তন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষককে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেদিন শেখ মুজিবও একটি স্বাধীন দেশে বীরের বেশে ফিরেছিলেন এবং তার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। তবে বিশ্লেষকরা একটি সতর্কবার্তাও দিচ্ছেন, অত্যধিক জনপ্রিয়তা অনেক সময় নেতিবাচক মোড় নিতে পারে। শেখ মুজিবুর রহমানের সেই বিশাল জনপ্রিয়তা শেষ পর্যন্ত একদলীয় শাসন ও ফ্যাসিবাদের দিকে ধাবিত হয়েছিল, যার পরিণতি ছিল অত্যন্ত করুণ। তাই তারেক রহমানের এই বর্তমান জনপ্রিয়তা এবং দলের নিরঙ্কুশ সমর্থন যেন তাকে কোনোভাবেই স্বৈরাচারী পথে পরিচালিত না করে, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। ক্ষমতার মোহ এবং স্তাবকদের বেষ্টনী থেকে বের হয়ে তাকে সবদিক দিয়ে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে, যাতে ইতিহাসের সেই অপ্রীতিকর ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
একইসঙ্গে দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তনকে কেউ কেউ তুলনা করছেন এক ট্র্যাজিক নায়কের আবির্ভাবের মতো। দেশে ফেরার মাত্র চার দিনের মাথায়, ৩০ ডিসেম্বর ভোরে তিনি মাতৃহারা হন। দেশের রাজনীতিতে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ রোগভোগের পর ওইদিন ভোর ছয়টায় মৃত্যুবরণ করেন। দেশে ফিরে একবারও তার মায়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি, হাসপাতালের বাইরে এক মুহূর্তও তার পাশে থাকা হয়নি, এমনকি একবেলা মায়ের সঙ্গে বসে ভাত খাওয়ার সৌভাগ্যও তার হয়নি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি মায়ের সঙ্গে পাকসেনাদের হেফাজতে বন্দী ছিলেন। কিশোর বয়সেই হারিয়েছেন বাবা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। হাজার হাজার মাইল দূরে নির্বাসিত অবস্থায় বুকের ভেতর পাথরচাপা দিয়ে সহ্য করতে হয়েছে ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর যন্ত্রণা। দেশে থাকা মায়ের ওপর চালানো অত্যাচার, নির্যাতন ও নিপীড়নও তাকে অসহায়ভাবে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে দূর থেকে। ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পরও দেশে ফেরার পথে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় তাকে। মায়ের অবস্থা যখন সংকটাপন্ন, তখনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের পরিকল্পিত মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের শিকার হতে হয়। এসব প্রতিকূলতা ও ব্যক্তিগত বেদনার মুখেও নীরব থেকে সবকিছু সহ্য করেছেন তারেক রহমান।
দেশে ফেরার পর তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, মা সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে তার কাছে ফিরে আসবেন। দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দলকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম- মা চলে গেলেন, তাকে রেখে গেলেন সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ ও এতিম করে। অথচ তার ঠিক কিছুদিন আগেই তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে পরিকল্পিত নানা অপপ্রচারের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বেগম খালেদা জিয়া আগেই মারা গেছেন এবং তার মৃতদেহ নিয়ে রাজনীতি করা হচ্ছে- এমন বিভ্রান্তিকর প্রচার। একটি বিশেষ মহল দাবি করতে থাকে, দলীয় রাজনীতি ও আসন্ন নির্বাচনে সুবিধা নেওয়ার স্বার্থে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু গোপন রাখা হচ্ছে। এর ঠিক একদিন আগে, ২৯ ডিসেম্বর পল্টনের দলীয় কার্যালয় পরিদর্শনে এসে নিচে অবস্থানরত হাজারো নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে তরুণ ও উদ্দীপনাময় নেতার মতো বক্তব্য দেন তারেক রহমান। কিন্তু পরদিন ভোরে এভারকেয়ার হাসপাতাল ছাড়ার সময় এবং পরবর্তী সময়ে গুলশান কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হয়ে তার ক্লান্ত, বিমর্ষ ও বেদনাহত মুখচ্ছবি মানবিক বোধসম্পন্ন প্রতিটি মানুষকেই ব্যথিত করে। সেই দৃশ্যের সামনে সকল অপপ্রচার যেন পরাজিত হয়ে যায়!
এতসব ঘটনার পরও এই ‘নতুন’ তারেক রহমান যেন নিজের প্রতিটি আচরণ ও সিদ্ধান্তে মুগ্ধ করে চলেছেন, এমন কী যারা একসময় তার কট্টর সমালোচক ছিলেন, তাদেরও। ৩১ ডিসেম্বর মায়ের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে তাকে কোরআন তিলাওয়াত করতে দেখা যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক কোটি মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত মায়ের জানাজায় এক মিনিটেরও কম সময়ের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি বলেন, “আমি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান। আজ এখানে উপস্থিত সকল ভাই ও বোনদের কাছে অনুরোধ, মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া জীবিত থাকা অবস্থায় যদি আপনাদের কারো কাছ থেকে কোনো ঋণ নিয়ে থাকেন, দয়া করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমি ইনশাআল্লাহ তা পরিশোধের ব্যবস্থা করবো।” এই বক্তব্যের বাইরে তিনি আর একটি বাক্যও বলেননি। মায়ের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে কোনো বক্তব্য দেননি, প্রশস্তি করেননি, কাউকে দোষারোপ বা কারো প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করেননি, কিংবা কোনো রাজনৈতিক মন্তব্যও করেননি।
দাফনের সময় তাকে পরিবারের সকল সদস্যের সঙ্গে একই কাতারে দাঁড়াতে দেখা যায়। স্ত্রী, একমাত্র কন্যা, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী এবং তার দুই কন্যাকে পাশে নিয়ে তিনি মায়ের দাফন সম্পন্ন করেন। পরিবারের নারীদের সঙ্গে কদম মিলিয়ে চলতে গিয়ে একজন ভদ্র ও সংযত মানুষ হিসেবে বারবার থেমে দাঁড়িয়ে একই কাতারে পথ চলার দৃশ্যটি উপস্থিত অনেকের নজর কাড়ে। ওই রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড পেজ থেকে তিনি অন্তর্বর্তী সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দেশবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান।
মায়ের মৃত্যুর পরও ব্যক্তিগত শোক পালনের অবকাশ যেন এক মুহূর্তের জন্যও তার জীবনে আসেনি। বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে মাকে দাফন করে ফিরেই দলীয় প্রয়োজনে একের পর এক ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে বসতে হয়েছে তাকে। মায়ের কুলখানিতে তাকে দেখা যায় হাতে জুতো নিয়ে চলতে। উপস্থিত সকল নেতাকর্মী ও অতিথিদের সঙ্গে মাটিতে বসে দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন তিনি। একই দিনেই শহরের সৌন্দর্য রক্ষার স্বার্থে রাজধানীজুড়ে বিএনপি নেতাদের নামে টানানো সকল ব্যানার ও ফেস্টুন অপসারণের নির্দেশ দেন তারেক রহমান। এর আগেও তারেক রহমানের নির্দেশনাতেই ২৬ ডিসেম্বর তার গণসংবর্ধনার স্থান জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে এবং ৩১ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার জানাজার স্থান মানিক মিয়া এভিনিউ দলীয় উদ্যোগে পরিষ্কার করা হয়।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হিংসা ও বিদ্বেষ পরিহার করে সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনীতির চর্চার প্রতিফলন হিসেবে তাকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেও দেখা যায়। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে আসা জামায়াত আমিরকে তিনি নিজের পাশে বসান। একজন দলীয় প্রধান হিসেবে নিজেকে কেন্দ্রস্থলে রাখার পরিবর্তে সমমর্যাদার পরিবেশ তৈরির এই আচরণ রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। একইভাবে, যে ডাকসু ছাত্র নেতারা তার বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মিছিল করেছে, তাদের সঙ্গেও তিনি সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, “মতের ভিন্নতা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমাদের ঐক্যমত অটুট থাকতে হবে।” দেশের স্বার্থে তিনি তরুণ সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বানও জানিয়েছেন।
ডাকসু নেতাদের সঙ্গে এই সাক্ষাৎকালে তারেক রহমানের আচরণে রাজনৈতিক বদান্যতা ফুটে উঠেছে, যার প্রশংসা করেছেন বিশ্লেষকরা। একইভাবে, দেশের একটি আলোচিত দৈনিকের সম্পাদককে সঙ্গে সাক্ষাৎ করাটাকেও তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। এক সময়ের ওই আস্থাভাজন ব্যক্তি, বর্তমানে তারেক রহমানের বিরুদ্ধ প্রচারণার জন্য পরিচিত হলেও, এই সাক্ষাৎ তার রাজনৈতিক পরিপক্কতা ও সংযমের প্রমাণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তেমনই, তারেক রহমান নিজেকে তোষামোদমুক্ত রাখার জন্যও সচেষ্ট। বাংলাদেশের অতীত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যেখানে নেতারা প্রশংসা পেতে পছন্দ করেন, বয়স যাই হোক- তরুণ থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ সকলের কাছ থেকে সম্মান কুড়াতে চেষ্টা করেন, সেখানে তাকে দেখা গেছে দলের মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সকল সদস্যকে শ্রদ্ধার সঙ্গে মর্যাদা দিতে। এমনকি কিছু দলীয় নেতা গুলশান কার্যালয়ে পা ছুঁয়ে সালাম করতে এলে, তিনি হাত দিয়ে তাদের সরিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন- এই তোষামদের রাজনীতিকে তিনি আর প্রশ্রয় দেবেন না।
এই তারেক রহমানকে দেখলে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে- তবে কি তিনি সবসময়ই এমন ছিলেন? তার বিরুদ্ধে প্রচারিত সবই কি মিথ্যা ছিল? রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রমাণ ছাড়া এসব সত্য-মিথ্যা নিয়ে মন্তব্য করা যে কারো পক্ষেই অনুচিত হবে। তবুও, আজকের তারেক রহমানের সঙ্গে ১৮-১৯ বছর আগে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হিসেবে পরিচিত তারেক রহমানের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। সেসময় তারেক রহমান কথা বলতেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষায়, যেখানে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিষাদাগার ছড়ানোই জনপ্রিয় ছিল। সে সময় তিনি তৃণমূল রাজনীতি এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে ততটা ওয়াকিবহাল ছিলেন না। ক্ষমতায় থাকা একজনের পক্ষে নিপীড়নের অভিজ্ঞতা বোঝা প্রায় অসম্ভব। তবে গত ১৭ বছর নির্বাসিত জীবনে তিনি সেই নিপীড়নের ভেতর দিয়ে গিয়েছেন, যা তাকে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, সংযমী এবং পরিপক্ক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সংবাদকর্মী ২০২২ সালে তার লন্ডন সফরে তারেক রহমানের সঙ্গে একান্ত বৈঠকের স্মৃতিচারণ করে বাংলানিউজকে বলেন, “২০২০ সালেও ইউটিউবে তার ভিডিওগুলোতে আওয়ামী লীগকে নিয়ে নানা মন্তব্য করতে শুনেছিলাম। কিন্তু ২০২২ সালের নভেম্বরে তার সঙ্গে লন্ডনে একান্ত বৈঠকের সুযোগ হওয়ায় আমার আগের ধারণা একদম পাল্টে গেল। আমি একজন নতুন তারেক রহমানকে দেখতে পেলাম- ভদ্র, মার্জিত এবং গোছানো। দেশ নিয়ে তিনি নানা পরিকল্পনার কথা জানালেন ৪০ মিনিটের সেই বৈঠকে। তখন বুঝতে পারলাম, লন্ডনে তার পাশে এমন মানুষ রয়েছেন, যারা তাকে সঠিক পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন।”
যেই তারেক রহমানকে ঘিরে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে এত আলোচনা-সমালোচনা চলেছে, যাকে কেন্দ্র করে ‘হাওয়া ভবন’ সম্পর্কিত এক-এগারোর সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী দীর্ঘ আওয়ামী লীগ শাসনামলে ধারাবাহিক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়েছে- তার এই আমূল পরিবর্তন কি শুধুই রাজনৈতিক কৌশল? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই প্রশ্নে খুব একটা একমত নন। বরং তারা খেয়াল করছেন, বদলে যাওয়া তারেক রহমানের পেছনে কে দাঁড়িয়ে আছেন এবং কীভাবে সেই বলয় গড়ে উঠেছে। দেশে ফেরার পর তাকে ঘিরে দেখা যাচ্ছে একদল তরুণ, মার্জিত ও উচ্চশিক্ষিত মানুষকে- যারা যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী। বিশ্লেষকদের মতে, দেশ-বিদেশের এসব গবেষণামুখী ও আধুনিক চিন্তাধারার মানুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সক্রিয় গবেষণা ও পরামর্শ সেল থেকে তার নীতিনির্ধারণে নিত্যনতুন তথ্য, বিশ্লেষণ এবং দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হচ্ছে, যা তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্যকে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত ও সমৃদ্ধ করেছে।
দেশে ফেরার পর তারেক রহমানের পাশে দেখা যায়নি তার এক সময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুন বা সেই পুরনো বলয়ের কোনো সদস্যকে। বরং বর্তমানে তার ছায়াসঙ্গী হিসেবে পাশে রয়েছেন আব্দুর রহমান সানি, মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন, আতিকুর রহমান রুমন, গিয়াস উদ্দিন রিমন, মিয়া নুরুদ্দীন আহাম্মেদ অপু এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম। আব্দুর রহমান সানি তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনে তার পাশে ছিলেন। মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন ইউরোপে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের দায়িত্বে ছিলেন, যা তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের তত্ত্বাবধানে গঠিত হয়েছিল। আতিকুর রহমান রিমন বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য এবং ‘আমরা বিএনপি’ পরিবারের আহ্বায়ক। গিয়াস উদ্দিন রিমন লন্ডনে তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের সহচর ছিলেন। নুরুদ্দীন আহাম্মেদ অপু এক সময় তারেক রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। আর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম বর্তমানে তার প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তিনি একজন আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা বিশ্লেষকও।
তারেক রহমানের পাশে এখন আর গিয়াস উদ্দিন আল মামুন, শওকত মাহমুদ, মাহমুদুর রহমানের মতো ব্যক্তিরা নয়, বরং আছেন- ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খানের মতো ব্যক্তিরা, যারা তাকে নীরবে ও ধারাবাহিকভাবে নানামুখী পরামর্শ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত রাখতে সহায়তা করে যাচ্ছেন। এর পাশাপাশি ড. মাহদী আমিন, হুমায়ুন কবির, সালেহ শিবলী এবং কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানসহ এক ঝাঁক তরুণ ও উচ্চশিক্ষিত সহযোগীকে ঘিরে তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দেখছেন আশাব্যঞ্জক হিসেবে। তাদের মতে, এই বদলে যাওয়া তারেক রহমানের পেছনে ছায়ার মতো কাজ করছে এই নতুন প্রজন্মের মেধাবী ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষগুলো- নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে বক্তব্য ও আচরণে সার্বক্ষণিক ইতিবাচক, সংযত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে তাকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন। ফলে তারেক রহমানের এই নতুন বলয় ও তার সাম্প্রতিক প্রতিটি রাজনৈতিক পদক্ষেপকে বিশ্লেষকরা সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক হিসেবেই মূল্যায়ন করছেন।
তারেক রহমানের ঘনিষ্টজনরা বলছেন, এখনকার তারেক রহমান আর আগের তারেক রহমান একই মানুষ। দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিরোধী রাজনৈতিক বলয় থেকে তার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করা হয়েছে, অপবাদ দেওয়া হয়েছে, নেতিবাচক ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছে। ফ্যাসিস্ট শক্তি তাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য মিডিয়াকে ব্যবহার করেছে। তার শরীরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার রক্ত বইছে। তিনি তাদের আদর্শেই গড়া। মা-বাবার আদর্শ আর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি নিজেই সমৃদ্ধ হয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে দিতে, দেশের কল্যাণে তিনি অসংখ্য মানুষের পরামর্শ গ্রহণ করেছেন, নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন।
তারা আরও বলছেন, এখনকার তারেক রহমান আগেকার তারেক রহমানের চেয়ে সহনশীল, পরিপক্ক বা ভালো বলার মনে হলো, তার নামে যেসব অপপ্রচার ছিল সেগুলো স্বীকার করে নেওয়া। এটা একদমই ঠিক না। আগের তারেক রহমান সফল রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তৃণমূল বিএনপিকে দক্ষ হাতে সামলেছেন, যে কারণে গত ১৭ বছর ভয়ঙ্কর ফ্যাসিস্টের আমলে হাজার হাজার মাইল দূর থেকেও দলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছেন, দলকে সুসংগঠিত রাখতে পেরেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বাংলানিউজকে বলেন, “আজকের তারেক রহমান কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে মনে হচ্ছে না, বরং একজন পরিপক্ব ‘স্টেটসম্যান’ হিসেবেই মনে হচ্ছে। এটা তার পাশে থাকা লন্ডন কেন্দ্রীক মানুষদের প্রভাব হতে পারে। এছাড়া অভিজ্ঞতাও তাকে প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বের করে এনেছে বলে আমি মনে করি। তার এই আধুনিক ও সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি বিএনপির পুরনো নেতিবাচক ইমেজ ভেঙে এক নতুন ও ইতিবাচক যুগের সূচনা করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।”
এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি প্রবল আস্থাশীলতার কথা উল্লেখ করে বাংলানিউজকে বলেন, “১৭ বছরের অবর্ণনীয় জুলুম আর ব্যক্তিগত শোক সহ্য করেও আমাদের নেতা তারেক রহমান আজ প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির ডাক দিয়েছেন। ফ্যাসিবাদের পতনে দেশের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। তারেক রহমান এখন আর শুধু আমাদের দলের নেতা নন বরং আমি মনে করি পথহারা জাতির জন্য এক দূরদর্শী ত্রাতা। তার এই নেতৃত্ব ও মেধাভিত্তিক পরিকল্পনা বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে নতুনভাবে পরিচিত করবে বলে আমার বিশ্বাস।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের ১৭ বছরের দীর্ঘ নির্বাসন মূলত নিজেকে নতুনভাবে গড়ার প্রস্তুতির সময় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। লন্ডনের উচ্চশিক্ষিত ও আধুনিক চিন্তাধারার পরামর্শক দলের সহায়তায় তিনি আজ এক নতুন রাজনৈতিক ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন। তারা বলছেন, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পথ বেছে না নিয়ে তিনি নিজেকে পরিণত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এটা প্রমাণ করে, প্রতিহিংসা মানুষকে শুধু ক্ষতি করে না, বরং মহত্ত্ব শেখাতেও পারে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এই ‘বদলে যাওয়া তারেক রহমান’ কতটা সফল হবেন, তা সময়ই বলে দেবে। তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা একমত, ১৭ বছর আগে তার ‘নেতিবাচক ইমেজ’ ভেঙে তিনি যে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন, তা অনস্বীকার্য।
সূত্র : বাংলা নিউজ






































