
রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। দীর্ঘদিন পর প্রতিযোগিতামূলক আবহে হতে যাওয়া এই নির্বাচন সামনে রেখে জনমত নিজেদের পক্ষে টানতে এরই মধ্যে ইশতেহার বা ম্যানিফেস্টো (সরকার গঠনের সুযোগ পেলে দেশের জন্য পরিকল্পনার ফর্দ জাতির সামনে তুলে ধরা) ঘোষণা করেছে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। যাতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সুশাসন, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন, রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কার, মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপন, বেকারত্ব দূরীকরণ, বিপুলসংখ্যক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রবাসীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং পার্বত্যাঞ্চলে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখাসহ বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ে দুটি দলই প্রায় একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন ও বৈষম্য দূর করার সুনির্দিষ্ট কিছু ঘোষণাও রয়েছে তাদের ইশতেহারে।
বিএনপির ইশতেহারে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন, ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি-সংক্রান্ত মোট ৫১টি বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ, যুবকদের ক্ষমতায়ন, নারীদের জন্য নিরাপদ রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলার সার্বিক উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, ব্যবসাবান্ধব অর্থনীতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ সরকার পরিচালনায় ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেছে। যার নাম দিয়েছে ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার নির্বাচনী ইশতেহার’।
ভোটগ্রহণের সময় ঘনিয়ে আসায় এখন এই দুই দলের নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে নানা মহলে চলছে আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ। কেউ কেউ দল দুটির ইশতেহারের মধ্যে পার্থক্য ও ইতিবাচক দিকগুলো খুঁজছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে প্রতিশ্রুতির প্রাধান্য রয়েছে বিএনপির ইশতেহারে। আর জামায়াতের ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে অল্প কথায় প্রতিশ্রুতি এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দলই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিজ নিজ ইশতেহার জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে। এখন দেখার বিষয়, ভোটাররা তাদের ইশতেহার কীভাবে গ্রহণ করছেন। সাধারণভাবে বলা যায়, যারা বেশি ভোট পাবেন, তাদের ইশতেহারই বেশি গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কারও কারও মতে, বিএনপির ইশতেহার জামায়াতের চেয়ে ‘মাচ বেটার’ বা অপেক্ষাকৃত অনেক ভালো।
মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতিতে ৯টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে সাজানো হয়েছে বিএনপির এই ইশতেহার। সরকার গঠনের সুযোগ পেলে দেশ ও জনগণের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে অন্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা বলা হয়েছে। রয়েছে দেশের প্রতিটি পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘ফ্যাসিস্ট আমলে’ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের আশ্বাস এবং বিগত সময়ে নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফাকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত।
বিএনপি ‘দ্য প্ল্যান’ আখ্যা দিয়ে তাদের ইশতেহারকে পাঁচটি মৌলিক অংশে ভাগ করেছে। সেগুলো হচ্ছে—রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কার; বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন; ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার; অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি। দলটি প্রতিটি অংশের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলাদা ও বিশেষ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
অন্যদিকে, জামায়াতের ইশতেহারে তাদের প্রতিশ্রুতিগুলোকে আটটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম ভাগে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষায় বৈষম্যহীন, শক্তিশালী ও মানবিক বাংলাদেশের কথা বলেছে। দ্বিতীয় ভাগে আত্মনির্ভরতার পথে নিজ পায়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয়, তৃতীয় ভাগে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ব্যাপকভিত্তিক কর্মংস্থান, চতুর্থ ভাগে স্বনির্ভর কৃষি ও প্রকৃতির স্বাভাবিক বিকাশের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, পঞ্চম ভাগে মানবসম্পদ ও জনজীবনের মৌলিক মানোন্নয়ন, ষষ্ঠ ভাগে সমন্বিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সপ্তম ভাগে যুবকদের নেতৃত্বে প্রযুক্তি বিপ্লব ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এবং অষ্টম ভাগে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র বিষয়ে পরিকল্পনা তুলে ধরেছে।
বিএনপি তাদের ইশতেহারে ৯টি বিশেষ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রতিশ্রুতিগুলো হচ্ছে—প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং এই অর্থসেবার পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো; উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বীমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা; দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা; জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবাসহ রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা; আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন এবং প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা ও ‘মিড-ডে মিল’ চালু; তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণসহ মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত; স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খনন ও পুনর্খনন, ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু; ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু; ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ।
বিএনপি বলছে, এই ইশতেহার শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। জনগণের অধিকারই বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা—এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।
অন্যদিকে জামায়াত সরকার পরিচালনায় ‘অগ্রাধিকার’ আকারে ২৬টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ গঠন, বৈষম্যহীন ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ, যুবকদের ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অগ্রাধিকার, নারীদের জন্য নিরাপদ মর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন, আইনশৃঙ্খলার সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র গঠন, সব পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সমাজ গঠন; প্রযুক্তি ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি, শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ। এ ছাড়া ব্যাংক খাতে সংস্কার ও ব্যবসাবান্ধব অর্থনীতি, পিআর পদ্ধতির নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা; বিগত সময়ের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার, মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা, ভেজালমুক্ত নিরাপদ খাদ্যের নিরাপত্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি ও মানসম্মত কাজের পরিবেশ, নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু নয়; বরং নাগরিক হিসেবে সব নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা, পিছিয়ে থাকাদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা; আধুনিক ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত এবং গরিব-অসহায়দের জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার কথা বলেছে জামায়াত। শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার ও দরিদ্রদের জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।
বিএনপি সাংবিধানিক সংস্কারের অংশ হিসেবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধানে অগণতান্ত্রিক সংশোধনী বাতিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃজন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, উচ্চকক্ষে ১০ শতাংশ নারী, জাতীয় সংসদের বিভিন্ন কমিটিতে সভাপতি পদ সংসদে প্রাপ্ত আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দল থেকে নেওয়ার কথা বলেছে।
জামায়াতও বলেছে, নির্বাচিত হলে ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে মনোনীত করা হবে ও সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি পদে বিরোধী দলের সদস্যদের সংখ্যা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের চেয়েও বেশি হারে বরাদ্দ দেওয়া; সংসদ সদস্যরা যেন স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারেন, সেজন্য সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন; দলীয় শৃঙ্খলার নামে সংসদ সদস্যদের জাতীয় ও জনস্বার্থে স্বাধীনভাবে কাজ করা থেকে বিরত রাখা হবে না।
বিচার বিভাগ সম্পর্কে বিএনপি বলেছে, বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে, মামলার জট হ্রাস ও বিচারপ্রাপ্তি হয়রানিমুক্ত করা, বিচার সেবার আধুনিকায়ন, জুডিসিয়াল কমিশন গঠন ও সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন পৃথক সচিবালয়কে আরও শক্তিশালী করা, সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হবে।
অন্যদিকে বিচার প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন, পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারক নিয়োগ, স্বতন্ত্র প্রসিকিউশনস ও তদন্ত সংস্থা গঠন, নিবর্তনমূলক ও মানবাধিকার পরিপন্থি আইন সংস্কার, ধর্মভিত্তিক আইন সংস্কার ও সংরক্ষণ, পরিবারিক আদালত আইন ও বিধিমালা আধুনিকায়ন, বিশেষায়িত আদালত স্থাপন ও সম্প্রসারণ, সাক্ষ্য আইন আধুনিকায়ন, পুরোনো আইনকে যুগোপযোগী করা, ওয়াকফ ও যাকাত-সংক্রান্ত আইন সংস্কার, পারিবারিক আদালত আইন ও বিধিমালার আধুনিকায়ন, ওয়াকফ ও যাকাত-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের কথা বলা হয়েছে জামায়াতের ইশতেহারে।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ে বিএনপির ইশতেহারে শিক্ষা খাতে পর্যায়ক্রমে ডিজিডির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, ফ্রি ওয়াইফাই নীতিমালা, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব, মিডডে মিল চালু, পরিচ্ছন্ন টয়লেট ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বিষয়ে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার, বাধ্যতামূলক তিন ভাষা শিক্ষা, ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি কার্যক্রম ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ে বলা হয়েছে—ইনোভেশন গ্র্যান্ট, স্টুডেন্ট লোন, বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় সহায়তা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় করমুক্ত রাখা। মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বিষয়ে বলা হয়েছে, মাদ্রাসা শিক্ষায় আধুনিকায়ন, কওমি সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, আলেমদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও চাকরিতে অগ্রাধিকার থাকবে।
অন্যদিকে জামায়াত স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন, শিক্ষা খাতে পর্যায়ক্রমে ডিজিপি ৬ শতাংশ বরাদ্দ; বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছলদের বিনাসুদে ঋণ (করজে হাসানা) ও প্রথম দুই সেমিস্টার ফি সরকার থেকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাসে ৩ হাজার টাকা করে বৃত্তি দেওয়া, স্নাতক পর্যায়ের এক লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীকে মাসে ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ (করজে হাসানা) দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে সব মাধ্যমে বাংলা, বিজ্ঞান, গণিত, প্রযুক্তি ও ইংরেজি বিষয়ে অভিন্ন পাঠ্যমান ও পাঠ্য পুস্তক প্রণয়ন করাসহ বিভিন্ন বিষয় ইশতেহারে যুক্ত করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর, ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোকে সরকারি ও প্রতিটি জেলায় একটি আলিয়া মাদ্রাসা সরকারীকরণের কথাও বলা হয়েছে।
বিএনপি বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে সামাজিক সুরক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষি ও খাদ্য, কর্মসংস্থান ও যুব উন্নয়ন, শিক্ষা, মানবসম্পদ ও স্বাস্থ্য সেবা, শ্রমিক ও প্রবাসী কল্যাণ, পরিবেশ পানি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে পৃথক পৃথক পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। একইভাবে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে বিএনপি অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন, বিনিয়োগ ও আর্থিক খাত সংস্কার, শিল্প খাত ও সৃজনশীল উন্নয়ন, সেবা খাতের উন্নয়ন, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও পরিবহন খাত উন্নয়ন, আইসিটি, রাজস্ব আয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে পৃথক পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন হিসেবে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী প্রতিষ্ঠা, উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন, হাওর-বাঁওড় বিল উন্নয়ন, উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন, নগরায়ণ ও আবাসন এবং নিরাপদ ও টেকসই ঢাকা বিনির্মাণ ও পর্যটন খাত নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। একইভাবে ৪১টি মন্ত্রণালয় ও সরকারি বিভাগের খাতওয়ারি পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছে জামায়াতে ইসলামী।
বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ: গবেষক ও রাজনীতির বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী দুটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার খুবই ভালো হয়েছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, বাস্তবায়ন নিয়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপির ঘোষিত ইশতেহার সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক। তবে বাস্তবায়নের দিকটি এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।’
সূত্র: কালবেলা








































