প্রচ্ছদ হেড লাইন ‘যৌন নিপীড়ক, তহবিল তছরুপকারী পর্যবেক্ষক’ দিয়ে নির্বাচনের প্রশংসা, বেরিয়ে এলো থলের বিড়াল

‘যৌন নিপীড়ক, তহবিল তছরুপকারী পর্যবেক্ষক’ দিয়ে নির্বাচনের প্রশংসা, বেরিয়ে এলো থলের বিড়াল

হেড লাইন: ভাড়াটিয়া পর্যবেক্ষক দিযে রবিবার অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রশংসা আদায়ের পর একে একে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। এসব পর্যবেক্ষকদের কাউকেই সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার পাঠায়নি। তারা অনেকটাই ‘ভাড়া খাটতে’ এসেছেন। বিস্তারিত অনুসন্ধানের পর কথিত এসব ভাড়াটে পর্যবেক্ষকদের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে বাংলা আউটলুক। এর আগে নির্বাচন পর্যাবেক্ষণে আসা পর্যবেক্ষকরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এমন সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। এসব পর্যবেক্ষকদের পক্ষ থেকে সোমবার ঢাকায় একটি সংবাদ সম্মেলনের পর বিষয়টি আমলে নিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে ঢাকাস্থ বেশকিছু দেশের দূতাবাস। সোমবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনোত্তর প্রতিক্রিয়া জানায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে ও জাপানের পর্যবেক্ষক দল।

পর্যবেক্ষক দলের নেতৃত্ব দেন মার্কিন সাবেক কংগ্রেসম্যান মি. জিম বেটস, নির্বাচন পর্যবেক্ষক যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিশ্লেষক টেরি এল ইজলে ও আমেরিকার দ্য হোয়াইট হাউস ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এনএসসি) চিফ অব স্টাফ আলেকজান্ডার বার্টন গ্রে ও সাউথ এশিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোরামের নির্বাহী পরিচালক জাপানের নাগরিক পাওলো কাসাকা। দেশ ও বিশ্বের নামকরা গণমাধ্যমগুলোতে রবিবারের ভোটে ব্যাপক কারচুপির খবর উঠে এলেও এসব পর্যবেক্ষকরা তা ভুয়সী প্রংশসা করেন। এতে করে তাদের বিষয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি আমলে নিয়ে এসব পর্যবেক্ষকদের বিষয়ে জানতে আগ্রহী হয়। পর্যবেক্ষকদের বিষয়ে খোঁজ খবর করে তথ্য প্রমাণ পাওয়ার পর এই পর্যবেক্ষকদের নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একজনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নসহ নৈতিক স্খলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদের মধ্যে জিম বেটস যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও অঙ্গরাজ্য থেকে ১৯৮০ সালে সিনেটর নির্বাচিত হন। ইউনিয়ন ট্রিবিউন ও দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইলের প্রতিবেদনে বলা হয়, জিম বেটস তার কলিগদের যৌন হয়রানি করতেন। এ জন্য ১৯৮৮ সালে একজন নারী ও একজন পুরুষ তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। যা আদালতে প্রমাণিতও হলে প্রচলিত আইনে তার শাস্তি হয়।
১৯৯২ সালের ২১ মার্চ লস এনজেলস টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জিম বেটস তার ক্ষমতা ব্যবহার করে বড় ধরণের আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছেন। যা বেশ কয়েক বছর পর প্রকাশ্যে আসে। এছাড়া ওই প্রতিবেদনে বহু নারী ও পুরুষের সঙ্গে যৌন নিপীড়ন মূলক আচরণের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। এছাড়া ১৯৮৯ সালের ১৯ অক্টোবর ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে তার নারী নির্যাতনের বিষয়ে বিস্তর প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। টম কেনওয়ার্থির ‘রিপাবলিকান বেটস রিপ্রুভড ফর মিস কনডাক্ট’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে হাউস এথিকস কমিটি কর্তৃক যৌন অনৈতিকতার অভিযোগের সত্যতা পায় এবং তাকে শাস্তি দেয়। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় জেম বেটসই প্রথম কংগ্রেস সদস্য যাকে যৌন হয়রাণির জন্য শাস্তির মুখে পড়তে হয়। পর্যবেক্ষকদের মধ্যে কানাডার ভিক্টর ওহ এবং চন্দ্র আর্য রয়েছেন। এর মধ্যে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভিক্টর ওহর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নীতি ও স্বার্থ বিরোধী কর্মকান্ড পরিচালনার অভিযোগ আনে কানাডার সিনেটের নীতিশাস্ত্র পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা। এর জেরে ওই বছরের ১৮ জুন সিনেটের নীতি ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব কমিটি ওহ-এর জন্য নিন্দার সুপারিশ করে এবং তাকে সিনেটের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য অনুরোধ করে।

অন্যদিকে চন্দ্র আর্যের বিরুদ্ধেও রয়েছে আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ। ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি ও সহযোগীরা ২১ হাজার ৯৩১ ডলার রাষ্ট্রীয় অর্থ তছরুপ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পর্যবেক্ষক দলে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম-এসএডিএফ’র নির্বাহী পরিচালক পাওলো কাসাকা। বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে তিনি চমৎকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে বিশ্বজুড়ে ভুয়া সংবাদ মাধ্যম ও এনজিও তৈরি করার অভিযোগ রয়েছে। তিনি ভারতের অর্থায়নে বিগত ১৫ বছর ধরে ৭৫০ এর বেশি ভুয়া সংবাদ মাধ্যম এবং এনজিও তৈরি করে পাকিস্তান ও চীনের বিরুদ্ধে ভুয়া বিশেষজ্ঞদের বরাতে নানান ভুয়া ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে আসছেন। এই পাওলো কাসাকা এবং তার সংস্থা সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের কাজ মূলত বিশ্বজুড়ে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে অর্থ উপার্জন করা। পাওলো কাসাকা সম্পর্কে ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর বিবিসি, ‘দ্য ডেড প্রফেসর অ্যান্ড দ্য ভাস্ট প্রো-ইন্ডিয়া ডিসইনফরমেশন ক্যাম্পেইন’ শিরোনামে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে পাওলো কাসাকার বিশ্বব্যাপী বাটপারির সবিস্তর চিত্র তুলে ধরা হয়। এদিকে নির্বাচন নিয়ে সরকারের সঙ্গে আগে থেকেই দূরত্ব সৃষ্টি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর। সে কারনে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ পশ্চিমারা কোনো পর্যবেক্ষক পাঠায়নি।

তবে সূত্র বলছে, পশ্চিমারা পর্যবেক্ষক না পাঠানোর ঘোষণায় ঢাকার পক্ষ থেকে এসব দেশের পর্যবেক্ষক টানতে জোর তৎপরতা চালায়। বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের তৎপরতায় অবশেষে ১৮৬ পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক ঢাকায় আসেন। কিন্তুতাদের কেউই সে দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি নয়। ঢাকায় তারা তথ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে।
রবিবার সারাদিন এসব পর্যবেক্ষকরা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সোমবার ঢাকায় জানানো প্রতিক্রিয়ায় নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবাধ দাবি করলেও এতে ভোটার উপস্থিতি কম ছিলো বলে তারা উল্লেখ করেন। এদিকে এসব পর্যবেক্ষকের এ প্রতিক্রিয়াকে অনেক গণমাধ্যম তাদের প্রতিবেদনে সে দেশের প্রতিক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করে। এমনকী সরকার সংশ্লিষ্ট কেউ কেউও এমন দাবি করে। ফলে এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অবশেষে বিবৃতির মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করে ঢাকাস্থ বিভিন্ন দেশের দূতাবাস। সোমবার ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে গণমাধ্যমকে জানায়, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেনি। নির্বাচন উপলক্ষে কয়েকজন বেসরকারি নাগরিক বাংলাদেশে ছিলেন। তাদের বক্তব্য নিজেদের বা তাদের প্রতিষ্ঠানের, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নয়। এদিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করায় নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) ধন্যবাদ জানিয়েছে কানাডার নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা- এমন খবর প্রচারিত হওয়ার পর ঢাকাস্থ কানাডীয় হাইকমিশন জানিয়েছে বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কানাডা সরকার কোনো নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠায়নি। হাইকমিশন জানায়, এটি কানাডার সরকারের বক্তব্য নয়। স্বতন্ত্র কোনো মন্তব্যের সঙ্গে সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও জানায় হাইকমিশন।
এদিকে ঢাকার ব্রিটিশ হাইকমিশনের একটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাদের দেশের পর্যবেক্ষকের কথা হলেও বাংলাদেশে আসা কোনো পর্যবেক্ষকের বিষয়ে তাদের কাছে অফিসিয়ালি কোনো তথ্য নেই। সরকারিভাবে কোনো পর্যবেক্ষক এলে সেটি হাইকমিশনের নথিতে থাকার কথা বলেও জানায় সূত্রটি।