প্রচ্ছদ আজকের সেরা সংবাদ বিরোধী দল নির্বাচন বয়কট করায় বাংলাদেশকে চাপে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র

বিরোধী দল নির্বাচন বয়কট করায় বাংলাদেশকে চাপে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র

জাতীয়: আগামী রোববার বিরোধী দলের বর্জন করা নির্বাচনের মাধ্যমে ১৫ বছরের ক্ষমতার মেয়াদ আরও বাড়াতে চলেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন প্রশ্ন হল মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সরকারগুলো দেশটিকে গণতান্ত্রিকভাবে পিছিয়ে যাওয়ার জন্য শাস্তি দিয়ে চীনের দিকে ঠেলে দেবে কিনা।

দেশের বৃহত্তম বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তার মিত্ররা এই নির্বাচনকে ভুয়া নির্বাচন আখ্যা দিয়ে বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে। তারা ভোট কারচুপির বিষয়ে উদ্বিগ্ন এবং নির্বাচন তদারকির জন্য নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে হাসিনার পদত্যাগ চেয়ে আন্দোলন করে আসছে।

বাংলাদেশের রপ্তানির সবচেয়ে বড় ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আরও সোচ্চার হয়েছে। তারা সেপ্টেম্বরে হাসিনার ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের ও আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে হাসিনাকে (৭৬)। কারণ যুক্তরাষ্ট্র কঠোর কোনা পদক্ষেপ নিলে তার দশের অর্থনীতিতে আরও সরাসরি ধাক্কা লাগতে পারে। সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণদান কর্মসূচি আরও জটিল হতে পারে।

ওয়াশিংটন-ভিত্তিক উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ক্যারট অ্যান্ড স্টিক পলিসির মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করছে (যুগপৎ ভয় ও প্রলোভন দেখানোর কৌশল) এবং এতদিন পর্যন্ত কোনো লাভ হয়নি। ফলে, প্রশাসন নির্বাচন পরবর্তী কঠোর পদক্ষেপসহ প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে এমন সম্ভাবনাও রয়েছে।’

২০২২ সালে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিল, যার মধ্যে ওয়ালমার্ট ও গ্যাপ শীর্ষ ক্রেতা। পোশাক শিল্পে কাজ করে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক ও ৪৬০ বিলিয়ন ডলার অর্থনীতির প্রায় ১০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তাল। হাসিনার পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে গণবিক্ষোভের মধ্যে পুলিশের সঙ্গে বিরোধী সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নভেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলেছ, ২৮ অক্টোবর বিএনপির পরিকল্পিত সমাবেশের পর থেকে প্রায় ১০ হাজার বিরোধী কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস, যাকে হাসিনা একজন প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেন, এই সপ্তাহে তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় ঢাকার একটি আদালত তাকে সাজা দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার এক টেলিভিশন ভাষণে হাসিনা বলেন, তার আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার তিন মেয়াদে স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করেছে। তিনি বলেন, সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতিতে বিশ্বাস করে এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য দেশে প্রতিষ্ঠান উন্নত করেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আহ্বান বাড়িয়েছে। গত বছরের মে মাসে, সেক্রেটারি অব স্টেট অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন ঘোষণা করেছিলেন, নির্বাচনে হস্তক্ষেপ বা বাধা সৃষ্টিকারী যেমন ভোট কারচুপি বা ভয়ভীতি বা সহিংসতা ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত যে কোনও বাংলাদেশি নাগরিকের ওপর নতুন ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। সেপ্টেম্বরে ক্ষমতাসীন দল, আইন প্রয়োগকারী ও রাজনৈতিক বিরোধীদের অজ্ঞাত কর্মকর্তাদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।

ভারত হাসিনার সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং উদ্বিগ্ন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরও দৃঢ় পদক্ষেপ বাংলাদেশকে চীনের দিকে ঠেলে দেবে। উভয়ই ইতিমধ্যে শক্তিশালী বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

নভেম্বরে ভারত ও মার্কিন প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যখন নয়াদিল্লিতে বৈঠক করেন, তখন বাংলাদেশের নির্বাচন এবং মার্কিন ভিসা বিধিনিষেধ আলোচনায় গুরুত্ব দিয়ে উঠে আসে। সংশ্লিষ্টরা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। তারা বলেন, ভারত মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে নিষেধাজ্ঞাগুলো হাসিনার সরকারকে বিরোধিতা করতে পারে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসও ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভারতে ছয় দিনের নীরব সফর করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অফিসে সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি দেখা করেছেন বলেন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি। বুধবার এক নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফল খুব কাছ থেকে দেখছে কিন্তু ‘কোনও অগ্রগতির প্রতিক্রিয়ায় আমরা কী পদক্ষেপ নিতে পারি বা নিতে পারি না তা নিয়ে আগাম কোনো ধারণা নেওয়া হয়নি।’

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্ক রয়েছে এবং নয়াদিল্লি ১৯৭১ সালে সেনা মোতায়েন করে বাঙালিদের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি ২৯ ডিসেম্বর সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও অংশীদার হিসেবে আমরা সেখানে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দেখতে চাই। আমরা স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও প্রগতিশীলতরা জন্য বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখব।’

অর্থনৈতিক সক্ষমতা

প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার একটি দরিদ্র দেশ হলেও শেখ হাসিনার অধীনে বাংলাদেশ অর্থনীতি উন্নতি করেছে। দেশটি এশিয়ার সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও দারিদ্র্যের হার ক্রমাগতভাবে হ্রাস পেয়েছে ও ভারতের তুলনায় দেশটির মাথাপিছু আয় বেশি।

মহামারি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে ফেলেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস পেয়েছে এবং হাসিনাকে জরুরি ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের জন্য আইএমএফের কাছে যেতে বাধ্য করেছে। দেশটির অর্থনীতি এখনও ডলারের ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে।

এশিয়ার সবচেয়ে খারাপ পারফরমারদের মধ্যে গত বছর মুদ্রার মান প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে। স্টক ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। দেশের মুদ্রা ব্যবসায়ীদের হাতেই বর্তমানে বিনিময় হারের সীমা নির্ধারিত হয়ে থাকে।

ঢাকা-ভিত্তিক ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেডের গবেষণা প্রধান সেলিম আফজাল শাওন বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচনের ফলাফল ও নির্বাচন-পরবর্তী স্থিতিশীলতার শীর্ষে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ এবং বাজার কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় তার দিকে নজর থাকবে। নিবাচনের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনার ক্ষেত্রে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় তাও বিনিয়োগকারীরা মূল্যায়ন করবে।’

আইএমএফের তহবিল অব্যাহত রাখতে হাসিনার সরকার কর ও সুদের হার বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ডিসেম্বরে, নগদ সংকটে থাকা দেশটি ৬৯০ মিলিয়ন ডলার ঋণের অনুমোদন দিয়েছে আইএমএফ।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলেছে, তারা তার দাবিগুলো নিয়ে চাপ দেবে এবং সমর্থকদেরকে তারা ‘প্রহসনমূলক’ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে কর না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করায় হাসিনার জয় এখন অনিবার্য বলে মনে হচ্ছে এবং তার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দল সম্ভবত স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জাতীয় পার্টির মতো দলগুলোর বিরুদ্ধে মুখোমুখি হবে। প্রয়াত সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৮২ সালে একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতায় আসেন।

রোববারের নির্বাচনে ভোটাররা সংসদের ৩৫০ আসনের মধ্যে ৩০০টিতে নির্বাচন করবে। অবশিষ্ট ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত। এক সাক্ষাৎকারে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেছেন, যদি হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় আসেন, সম্ভবত ঝুঁকি হল যে তিনি মনে করতে পারেন নিজের ইচ্ছামতো যে কোনো উপায়েই তিনি দেশ পরিচালনা করতে পারবেন, যা একটি আপত্তিজনক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। এটি এমন পরিস্থিতি যেখানে কোন জবাবদিহিতা নেই।’