প্রচ্ছদ রাজনীতি জানা গেল কেন কঠোর কর্মসূচিতে যাচ্ছে না বিএনপি

জানা গেল কেন কঠোর কর্মসূচিতে যাচ্ছে না বিএনপি

রাজনীতি : দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বয়কট করে হরতাল-অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করলেও কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না বিএনপি। বরং নির্বাচনকে ‘একতরফা’ আখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষকে ভোটদানে নিরুৎসাহিত করার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি। এর অংশ হিসেবে চলমান গণসংযোগ কর্মসূচি আরও জোরদার করা হবে।

গত রোববার রাতে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বিএনপির স্থায়ী কমিটির দীর্ঘ বৈঠকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চার ঘণ্টার ওই বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি সাংগঠনিক ও সহ সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জেলা, মহানগর, উপজেলা ও পৌর ইউনিটের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ৬৭১ জন যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি ঘিরে অন্য কোনো পক্ষকে নাশকতা করার সুযোগ দিতে চায় না বিএনপি। তা ছাড়া নেতাকর্মীদের আর নতুন করে ধরপাকড়ের মুখেও ঠেলে দিতে চায় না তারা। তাই সহিংসতা তৈরি হতে পারে, আপাতত এমন কর্মসূচিতে যেতে চায় না দলটি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএনপি এখন ধৈর্য সহকারে সতর্কতার সঙ্গে সামনে এগোনোর কৌশল গ্রহণ করেছে।

বিএনপির নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘একতরফা’ ভোট বর্জনের আহ্বান জানিয়ে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত দেশব্যাপী গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করা হবে। এর মধ্যে গতকাল সোমবার তিন দিনের লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। অবশ্য আন্দোলনের অংশ হিসেবে ভোটের আগের দিন ও ভোটের দিন দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেওয়া হতে পারে। এ ছাড়া নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে ভোটের পর দিনও হরতাল অব্যাহত রাখা হতে পারে। এরপর ‘একতরফা’ নির্বাচনের ফল বাতিল এবং একদফা দাবিতে নতুন করে জনগণকে সংগঠিত করতে সভা-সমাবেশের মতো জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হবে বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘বিএনপি বরাবরই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির পথে হেঁটেছে। কখনো কোনো নাশকতা বা সাংঘর্ষিক ঘটনায় জড়ায়নি। আগামীতেও সব কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকবে। বিএনপি মনে করে, তাদের এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে জনগণ সাড়া দেবে এবং এই সরকারের আয়োজিত আগামী ৭ জানুয়ারির ডামি নির্বাচনের ভোট বর্জন করবে।’

জানা গেছে, ৭ জানুয়ারির ভোট এবং আন্দোলন সামনে রেখে করণীয় নির্ধারণে গত রোববার সাংগঠনিক সম্পাদকদের নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কেউ কেউ ভোট ঠেকাতে হরতাল-অবরোধের টানা কর্মসূচি ঘোষণার পরামর্শ দিলেও বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে দলের হাইকমান্ড তা আমলে নেয়নি।

পাশাপাশি হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি ঘিরে অন্য পক্ষ নাশকতা-সহিংসতা করার সুযোগ পায়। এরপর বিএনপির ওপর তার দায় চাপিয়ে সরকারসহ কোনো কোনো মহল থেকে বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়। তা ছাড়া আন্দোলন ঘিরে গত ২৮ জুলাই থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ২৭ হাজারের বেশি নেতাকর্মী কারাগারে। এ অবস্থায় কঠোর কর্মসূচি দিলে নতুন করে গ্রেপ্তার শুরু হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় নেতাকর্মীর সংকট তৈরি হতে পারে। সব মিলিয়ে কোনো কোনো পক্ষ থেকে ভোট রুখে দেওয়া কিংবা প্রতিহত করার প্রস্তাব এলেও বাস্তবতা বিবেচনায় সে পথে হাঁটছে না দলটির হাইকমান্ড। এর পরিবর্তে ভোট বর্জনের প্রচারণা জোরদার করবে বিএনপি।

দলটি মনে করছে, গণসংযোগ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জনগণের কাছে যাওয়া যায়। জনগণ ভোট বর্জন করলে নির্বাচন দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য হবে না। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে যে তামাশা মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে, দেশবাসীর কাছে তা স্পষ্ট। নির্বাচনে নৌকা ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগের, বিদ্রোহী প্রার্থীও আওয়ামী লীগের। ১৪ দলের প্রার্থীরাও নৌকা প্রতীকে ভোট করছেন। ২৬ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা সমঝোতার ভিত্তিতে ভোট করছে। সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে ভোট করছে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অন্য ছোট দলগুলো। বিদেশিরাও এই পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো এরই মধ্যে এই নির্বাচন বয়কট করেছে। জনগণকেও ভোট বর্জনের আহ্বানে গণসংযোগ কর্মসূচি করা হচ্ছে। তাদের বিশ্বাস, এমন পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রের স্বার্থে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট বর্জন করবে। সরকার ও সরকারি দল জোর না করলে নির্বাচনে ৫ শতাংশের কম ভোট পড়বে। সেক্ষেত্রে ভোটের ফলাফল আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও ধারণা তাদের।

বিএনপি নেতাদের ধারণা, নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র কঠোরভাবে ভিসা নীতির প্রয়োগ ও ধাপে ধাপে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। এ জন্য নির্বাচনের পর জনগণকে সম্পৃক্ত করে কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হবে। এমন পরিস্থিতিতে দেশি-বিদেশি চাপে সরকার আলোচনার ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে গত ১২ জুলাই থেকে একদফার আন্দোলন শুরু করে বিএনপি। এরপর নির্বাচন বয়কট করে আন্দোলন অব্যাহত রাখে দলটি। প্রায় দুই মাস ধরে হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি পালন করা হয়। গত ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মহাসমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর চার দফায় পাঁচ দিন হরতাল এবং ১২ দফায় ২৩ দিন অবরোধ কর্মসূচি করে দলটি। এরপর ভোটের দিন ঘনিয়ে আসায় আন্দোলন জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভোট ঠেকাতে জনগণকে ভোট বর্জনের পাশাপাশি অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। যদিও অসহযোগ আন্দোলনের কার্যকারিতা নিয়ে এরই মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জনগণকে ভোট প্রদানে নিরুৎসাহিত করতে দেশব্যাপী গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণের মতো টানা কর্মসূচি শুরু করে বিএনপি।

তিন দিন বাড়ল গণসংযোগ কর্মসূচি: ৭ জানুয়ারির ভোট বর্জনে দেশব্যাপী চলমান গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণের কর্মসূচি আরও তিন দিন বাড়িয়েছে বিএনপি। আজ মঙ্গলবার থেকে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবে। গতকাল সোমবার বিকেলে এক ভার্চুয়াল সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী কর্মসূচি বাড়ানোর এ কথা জানান।