প্রচ্ছদ সারাদেশ ছাত্রলীগ নেত্রী সাইমুনের কথায় চলে বদরুন্নেসা

ছাত্রলীগ নেত্রী সাইমুনের কথায় চলে বদরুন্নেসা

দেশজুড়ে : রাজধানীর বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ ছাত্রলীগের নেত্রীদের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর, সিট বাণিজ্য, প্রশ্নফাঁস, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব নিয়ে একাধিকবার অভিযোগ দিয়েও মেলেনি প্রতিকার। বরং আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন তারা।

অভিযোগ দিয়ে বিচার পাওয়ার পরিবর্তে একাধিক শিক্ষার্থীকে নেত্রীদের বিরাগভাজন হয়ে উল্টো ছাড়তে হয়েছে হল। এখানে ছাত্রলীগের নেত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে বেপরোয়া সাধারণ সম্পাদক হাবিবা আক্তার সাইমুন। যিনি গত এক বছরে অন্তত ছয়-সাতজন শিক্ষার্থীকে মারধর করেছেন। বদরুন্নেসার ‘ডন’ হিসেবে পরিচিত এই নেত্রীর ‘শাসন’ চলে এখানে।

জানা গেছে, কলেজের হজরত ফাতেমা (রা.) ছাত্রীনিবাস (নতুন হল) হলের ৪০০৪ নম্বর রুমে থাকেন ছাত্রলীগ নেত্রী সাইমুন। রুমটিকে টর্চারসেলে পরিণত করেছেন তিনি। পান থেকে চুন খসলেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের রুমে ডেকে নিয়ে চালানো হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।

নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাখা ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেত্রী। জানতে চাইলে সভাপতি সেলিনা আক্তার বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা। এ ধরনের কাজ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কখনো করে না।

সাধারণ সম্পাদক সাইমুন বলেন, এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। এ ধরনের কিছু নেই। যারা এগুলো বলছে, তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে এবং ছাত্রলীগকে বিতর্কিত করার জন্য বলছে।

প্রতিবেদকের কাছে এসব ঘটনার ছবি এবং ভিডিও ফুটেজ আছে জানালে সাইমুন বলেন, ফুটেজ থাকলে সেগুলো বানানো; এডিট করা। এ ছাড়া আমার আর কিছুই বলার নেই। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ নিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের কাজে আমি জড়িত নই। কেউ তো সেখানে (পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষে) একাডেমিক কাজেও যেতে পারে। কেউ যদি সেই ছবি তুলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করে, তাহলে তো হবে না।

দুই নেত্রী অস্বীকার করলেও তাদের এসব অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। এ-সংক্রান্ত একাধিক ভিডিও-অডিওসহ তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। জানা যায়, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালাতে সাইমুনের রয়েছে নিজস্ব বাহিনী। নেত্রীর নির্দেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্যাতন, নামে-বেনামে তাদের কাছে চাঁদা তোলে তারা। এ ছাড়া ক্যান্টিন-ডাইনিং থেকে চাঁদা তোলা হয়। তারা প্রশ্নফাঁসের সঙ্গেও জড়িত। সাইমুনের হয়ে এসব অপরাধের নেতৃত্ব দেন অর্পিতা পলি, শ্রাবণী আক্তার তনিমা, ফারিয়া আলম অর্থি ও শাহিনুর ইসলাম শান্তা।

জানা যায়, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মারিয়া শাহরিন নামে এক শিক্ষার্থীকে বেধড়ক মারধর করেন ছাত্রলীগ নেত্রী সাইমুন। নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে তৃতীয় বর্ষের দুটি ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারেননি মারিয়া। এরপর মানসিক অত্যাচারের একপর্যায়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন তিনি। গত বছরের ২ মার্চ লাইজু আফরিন নামে এক শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় হল প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার মেলেনি। গত বছরের ৬ জুন নিশাত তাসনিম নামে আরেক শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয় সাইমুনের নেতৃত্বে। প্রতিবাদ করায় নিশাতকে হলছাড়া করা হয়। ১ অক্টোবর মারধর করা হয় তাওহীদা আক্তার নামে এক শিক্ষার্থীকে।

এ ছাড়া কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আখিনুর আক্তারের ওপর বারবার হামলা হওয়ায় তিনি রাজনীতি এবং কলেজ ছেড়ে চলে যান। গত বছরের ৪ অক্টোবর হুমায়রা মনি নামে এক শিক্ষার্থীকে দুই ঘণ্টা রুমে আটকে মারধর করা হয়। এ ছাড়া গত ২৪ জানুয়ারি কলেজের নতুন হলের ৩০১০ এবং ৩০০১ নম্বর রুম দখলে নিতে হামলা চালানো হয় সাইমুনের নেতৃত্বে। পরে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এলে তিনি দলবল নিয়ে চলে যান। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে সাইমুন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। নিজেদের মধ্যে এ সংঘর্ষে তার অন্তত তিন অনুসারী আহত হন।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষে অবাধ যাতায়াত: কলেজের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কয়েকটি ছবি এসেছে কালবেলার হাতে। এসব ছবিতে দেখা যায়, কক্ষের ভেতরে চারদিকে পরীক্ষার খাতা ও প্রশ্নপত্র স্তূপ করে রাখা। সাধারণত এসব রুমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঢোকার অনুমতি থাকে না। তবে শাহিনুর আক্তার নামে এক শিক্ষার্থীকে ওই রুমে ঢুকে দায়িত্বরত কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে।

চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে শাহিনুরের বিরুদ্ধে। আর তাকে এসব কাজে ছাত্রলীগ নেত্রী সাইমুন সহযোগিতা করেন বলে কলেজ সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগ অস্বীকার করে শাহিনুর বলেন, সেখানে বসে সন্ধ্যার পর এক মামা জামা-কাপড় বানায়। আমি সেখানে জামা বানাতে গিয়েছিলাম। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জামা বানায় কীভাবে, প্রশ্ন করলে শাহিনুর ফোন কেটে দেন।

লাখ টাকার সিট বাণিজ্য: কলেজটিতে দুটি ছাত্রীনিবাস রয়েছে। একটি নতুন হল এবং অন্যটি পুরোনো হল হিসেবে পরিচিত। পাঁচতলাবিশিষ্ট নতুন হলের প্রতিটি ফ্লোরে ১২টি করে রুম। প্রতিটি রুমে মেয়ে থাকেন ১৫ থেকে ১৮ জন। দুটি হলের দায়িত্বে দুই নেত্রী। এসব হলে সিট পেতে ধরনা দিতে হয় নেত্রীদের কাছে। হলে সিটপ্রতি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা করে নিয়ে থাকেন নেত্রীরা। দুটি হলেরই প্রথম তলা গণরুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই ফ্লোরের দায়িত্ব হল সুপারের হাতে। বাকি ফ্লোরগুলো চালান দুই নেত্রী। এর মধ্যে পাঁচতলাবিশিষ্ট হলের চারটি ফ্লোরের নিয়ন্ত্রণ সাধারণ সম্পাদক সাইমুনের হাতে। প্রতিটিতে ১২টি করে চার ফ্লোরে রুম আছে ৪৮টি। আর প্রতি রুমে ১৫ থেকে ২০ জন করে শিক্ষার্থী থাকেন। সর্বনিম্ন ১৫ জন করে শিক্ষার্থী ধরলেও চারটি ফ্লোরে থাকেন ৭২০ জন। এর মধ্যে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থীকে হলে উঠিয়েছেন সাইমুন। সেই হিসাবে ২৪০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অন্তত ৩৬ লাখ টাকার সিট বাণিজ্য করেছেন এ নেত্রী।

একই পদ্ধতিতে চলে কলেজের চারতলাবিশিষ্ট হলটিও। ভুক্তভোগী একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সাইমুন প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে হোস্টেল চার্জের ৭ হাজার করে টাকাও নিজে ওঠান। তবে তিনি তা হল কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেন না। পরবর্তী সময়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছে টাকা চাইলে তাদের লুকিয়ে থাকার পরামর্শ দেন ছাত্রলীগ নেত্রী।

হল-ডাইনিং থেকে চাঁদা উত্তোলন: কলেজের দুটি হলেই আবাসিক ছাত্রীদের খাবারের জন্য ডাইনিং রয়েছে। এসব ডাইনিং পরিচালনায় ছাত্রলীগের নেত্রীরা নিজেদের পছন্দমতো ম্যানেজার নিয়োগ দেন। ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন—এমন কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, প্রতিদিন বাজারের টাকা থেকে তাদের দুইশ করে টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া নেত্রীদের দিতে হয় আলাদা বাজার করে। মাস শেষে আবার এককালীন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেন তারা। যার প্রভাব পড়ে ডাইনিংয়ের খাবারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান বলেন, ‘এসব অভিযোগের বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে অভিযোগগুলো স্পর্শকাতর। বিষয়টি খতিয়ে দেখে কেউ দায়ী থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সার্বিক বিষয়ে জানতে বদরুন্নেসার অধ্যক্ষ সাবিকুন নাহারকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।