প্রচ্ছদ রাজনীতি অটোপাসে, নৌকা হারলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে সিলেটের দু’টি আসনে আ’লীগ...

অটোপাসে, নৌকা হারলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে সিলেটের দু’টি আসনে আ’লীগ নেতাকর্মীরা !

রাজনীতি: ২০১৮ সালে নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে বির্তকের শেষ নেই, দিনের ভোট রাতে এমন ঘটনায় নির্বাচন ব্যবস্থা হয়ে পড়ে আস্তাহীন। ভোটারদের মন-মস্তিষ্কে বদ্ধমূল ধারনা ভোট দিয়ে লাভ নেই, ফলাফল নির্ধারিত। এমন ঘটনা ঘটেছিল বিএনপিকে টার্গেট করে, ফলে নিরংকুশ বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছিল আওয়ামীলীগ। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেই, মুলত একাই লড়ছে আ’লীগ। ডামি, স্বতন্ত্র বা কিংস পার্টি সবই আ’লীগের ঘরের ভাই। যেই লাভ সেই কদু। হাইকমান্ড বিষয়টি এভাবে মূল্যায়িত করে পরিকল্পনা সাজালেও তৃণমুলে কিন্তু সর্ম্পক পরিণত হচ্ছে দা-কুমড়ায়। সেকারনে চিন্তিত, ব্যাকুল নৌকার প্রার্থীরা। কোন অদৃশ্য কলা কৌশলে ডামি, স্বতন্ত্র বা কিংস পার্টির প্রার্থীদের অটো পাসের পথ তৈরী হচ্ছে কি না ? যে পথে ২০১৮ সালে নির্বাচিত হয়েছিলে নৌকার মাঝিরা, সেই পথে বলি হতে পারেন হয়তো নিজেরাই, এরকম ভাবনা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ছে নৌকার প্রার্থী ঘিরে। তাই সিলেট-৫ ও সিলেট-৬ আসনে শংকিত নৌকার প্রার্থী ও সমর্থকরা। অথচ বিএনপি-জামায়াতবিহীন এ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীদের জয়রত ঠেকানোর স্বাভাবিক কোন সাধ্য নেই কারো। যেকোন বিচার, বিশ্লেষণ, জরিপ তথা মতামতে এমনটিই বাবস্তবতা। গত তিন মেয়াদের নির্বাচনে এই আসন দু’টিতে নিয়ন্ত্রন বজায় রেখেছে আ’লীগ।

নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বি দলগুলোর মধ্যে একমাত্র আ’লীগের রয়েছে তৃণমুলে সাংগঠনিক ভিত্তি। সেই সাথে দলের হাইব্রিড বা কাউয়াদের ভিড়। সবমিলিয়ে চারিদিকে সরকার দল তথা আ’লীগের ছড়াছড়ি। এমন বাস্তবতায় ডামি, স্বতন্ত্র বা কিংস পার্টির প্রার্থীর জন্য জয় দিবা স্বপ্ন বটে। সিলেট-৫ আসনে নৌকার প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা ্ও মহানগর আ’লীগ সভাপতি মাসুক উদ্দিন আহমদ। সেই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বেসরকারী সেবা সংস্থা সীমান্তিকের চেয়ারম্যান ড. আহমদ আল কবির (ট্রাক) ও অরাজনৈতিক সংগঠন আনজুমানে আল ইসলাহর সভাপতি মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী (কেটলি)। বাকী প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন তৃণমূল বিএনপির কুতুব উদ্দীন আহমদ শিকদার (সোনালী আঁশ), জাতীয় পার্টির শাব্বীর আহমদ (লাঙ্গল), বাংলাদেশ কংগ্রেসের বদরুল আলম (ডাব), এবং মুসলিম লীগ-বিএমএল এর খায়ারুল ইসলাম (পাঞ্জা)। এ প্রার্থীদের অবস্থান, অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। এ আসনে জনে, বলে সাংগঠনিক শক্তিকে এগিয়ে নৌকার প্রার্থী মাসুক উদ্দিন আহমদ। সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রত্যক্ষ চরিত্র তিনি। বাকী প্রার্থীদের কেউই নিজেদের ব্যক্তিগত অবস্থান ছাড়া সাংগঠনিক ভিত্তিতে ধারে কাছেও নেই মাসুক উদ্দিনের। অথচ নৌকার কর্মী সমর্থকদের টানা হেঁচড়া সহ প্রধানমন্ত্রীর আনুকূল্যে বুলি আউড়িয়ে বিজয়ের পথ খুঁজছেন কোন কোন প্রার্থী।

এমনকি প্রার্থীদের কেউ মনে করছেন, গভীর কলা কৌশলে বিজয় উপহার তাকে দেয়া হবে নির্বাচনে। সেকারনে মনের দিক থেকে মনোবলী তিনি। অনুসারীদেরও সেই গল্প শুনিয়ে তাজা রাখার চেষ্টা করছেন, অথচ নৌকার প্রার্থী ছাড়া এ আসনের প্রতিটি কেন্দ্রে এজেন্ট দেয়ার মতো সক্ষমতা নেই কোন প্রার্থীর। এমন বাস্তবতায় নৌকার প্রার্থীর পরাজয়কে কেউই স্বাভাবিক ভাবে গ্রহন করবেন না বলে দাবী স্থানীয় আ’লীগ সহ নৌকা সমর্থকদের। জকিগঞ্জ পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক দেলোয়ার হোসেন দিলু বলেন, ‘নৌকা হারবে কোন হিসেবে, নৌকা জিতবেই, কারন বাস্তবতা হলো নৌকার অনুকূলে। বছরের পর বছর ধরে আ’লীগ এ আসনকে শাসন করছে, জনগনের পাশে দাঁড়িয়েছে, দলের সাংগঠনিক ভিত্তি জিইয়ে রেখেছে। উড়ে এসে কেউ নৌকার বিজয় ছিনিয়ে নিলে এ ঘটনাকে লুঠ বলবো আমরা। আমরা থাকতে কেউ লুঠ করতে পারবে না। যদি এমনটি হয় তাহলে আমরাও মনে করবো এ ঘটনা নির্বাচন ব্যবস্থার ব্যর্থতা। তা হবে অষ্টম আশ্চর্য, যা অসম্ভব।’ এদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হুছামুদ্দীন চৌধুরী নিজের মনোনয়ন চুড়ান্ত করে সাক্ষাত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, দলের হাই কমান্ডের ইঙ্গিত রয়েছে হুছামুদ্দীনকে জেতাতে। সেকারনে প্রশ্ন নির্বাচন নিয়ে নাটক হচ্ছে না, ভিন্ন কোন কৌশল চলছে এই আসনে। স্থানীয় নৌকার কর্মীদের অভিমত, একদিকে নৌকা মনোনীত প্রার্থী দেয়া হবে, সেই সাথে দলের স্থানীয় নেতৃত্বশীলদের নৌকা ছেড়ে অন্যত্র কাজের পথ খুলে দেয়ার দ্বৈত নীতিতে ভবিষ্যত হুমকিতে পড়বে আ’লীগ রাজনীতি। নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হবে বৈরীতা, সংঘাত, অনৈক্য ও অবিশ^াস। এদিকে নৌকার প্রার্থী ও মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বি কোন কোন প্রার্থী নৌকার বিপক্ষে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন, নিজকে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের লোক বলছেন। এসব নির্বাচনে ঠিকে থাকা এবং অনুসারীদের নৌকার বিপক্ষে সক্রিয় করার একটা সস্তা কৌশল। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে নৌকার চেয়ে পছন্দের কোন কিছু হতে পারে না, সেই নৌকার প্রার্থী আমি। তিনি বলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরীক্ষিত সৈনিক। যে নৌকা, যে আ’লীগ, যে স্বাধীনতার জন্য জীবনবাজী রেখেছি, সেই নৌকাকে পরাজিত করে অটো পাসের মতলব আঁটছেন যে বা যারা, তারা মুলত নির্বাচন সুষ্ঠ ্ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে অটো পাসের ফন্দি ্ও জিকির তুলছেন। তিনি বলেন, এ আসনে আ’লীগ ঐক্যবদ্ধ এবং সংগঠিত। নৌকার দখল থেকে এ আসন উদ্ধারে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের কোন অবদান বা সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। অলিক স্বপ্ন দেখলে কিছু বলার নেই।

অপরদিকে, সিলেট-৬ আসনে নৌকার প্রার্থী সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি। তাকে চ্যালেঞ্জ করে জনপ্রিয়তা যাচাই করতে প্রার্থী হয়েছেন দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত সরওয়ার হোসেন (ঈগল)। একই আসনে তৃণমূল বিএনপির চেয়ারপারসন শমসের মুবিন চৌধুরী (সোনালী আঁশ) প্রার্থী হওয়ায় দৃশ্যত চাপে পড়েছেন নাহিদ। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ নৌকা রেখে মাঠে কাজ করছেন সোনালী আঁশের পক্ষে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, অংশগ্রহণমূলক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের স্বার্থে শমসের মুবিনকে বিজয়ী করতে রয়েছে চাপ। কিন্তু নৌকার স্থানীয় কমী সমর্থকদের মতে, এ আসন অতীত থেকেই আ’লীগ তথা নৌকার শক্তিশালী ঘাঁটি। নৌকার সমর্থকরা প্রার্থীর চেয়ে নৌকাকেই গুরুত্ব দেয়, সেই চেতনাকে যদি জোরে ঠেলে দেয়া হয় সোনালী আঁশের দিকে তাহলে তৃণমুলে আ’লীগের নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীন হবে সাধারন নেতাকর্মীরা। তারা এও বলেছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী কানাডা আ’লীগের সাবেক সভাপতি সরওয়ার হোসেন। তিনি দীর্ঘ দিন থেকে এমপি নাহিদের পাশাপাশি নিজেও দলের তৃণমুলে কাজ করেছেন, সাধারন মানুষের সুখে দু:খে পাশে দাঁড়িয়ে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেছেন। সেকারনে সাধারন ভোটারদের সাড়া পাচ্ছেন তিনি। স্থানীয় ভোটরদের জরিপে আ’লীগের এই নেতার মধ্যে ভোট ভাগাভাগি হতে পারে, সেরকম পরিবেশ পরিস্থিতি অস্বীকার করার কোন সুযোগ। তারপরও জয় পরাজয় সীমাবদ্ধ থাকবে এই দু’জনের মধ্যে। কিন্তু ঠিক উল্টে অবস্থানে সোনালী আঁশ প্রতীকের প্রার্থী তৃণমুল বিএনপির চেয়ারপার্সন শমসের মবিন চৌধুরী। নিজে দলেই যার অবস্থান এখন টালমাটাল। দলের সদস্যরা জাতীয় বেঈমান আখ্যায়িত করেছে তাকে। খোদ দলের চেয়ারপার্সনের নিজ নির্বাচনী এলাকায় তৃণমুল বিএনপির হদিস নেই। নেই তৃণমুলে সাংগঠনিক কোন ভিত্তি বা শক্তি। তার অবস্থান আমজনতার কাছে পরিস্কার, ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার তিনি। এই অবস্থায় এ আসনে বাস্তবতার বিপরীতে তিনি যদি বিজয়ী হন, তাহলে যেকোন অবস্থান থেকে লুঠ বা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর ফলাফল বলে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হবে দলমত নির্বিশেষে। বিষয়টি আ’লীগ তথা নির্বাচন কমিশনের জন্য হবে বুমেরাং। স্থানীয় দলের একটি সূত্র বলছে, শমসের মবিন চৌধুরী এ আসনে পাস করবেন কল্পনা করতে পারে না কেউ, কারন কল্পনারও রয়েছে একটি বাস্তবতা। কিন্তু এ আসনে সেরকম কোন পরিবেশ নেই, কোন প্রার্থীর বিজয়ের জন্য দল অর্ধেক ও ব্যক্তি ইমেজ দরকার অর্ধেক। এই দুইটির কোনটিই নেই শমসের মবিনের। ভোটারদের কাছে তিনি দলছুট ও সুবিধাভোগী ব্যক্তি। তারর্পও সরকারের শীর্ষ মহলের বিশেষ কৌশলে শমসের মবিনকে এ আসনে বিজয়ী করা হবে, এমন কথা অনেকের মুখে মুখে রটানো হচ্ছে। এরকম ঘটনা ঘটলে, নির্বাচনের স্বচ্ছতা, গ্রহনযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে স্থানীয় আ’লীগের নেতাকর্মীরাই।

জেলা আওয়ামীলীগের প্রচার সম্পাদক ও নৌকার প্রার্থী সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের নির্বাচন সমন্বয়কারী এডভোকেট আব্বাস উদ্দীন বলেন, সিলেট-৬ আসনে সাংগঠনিক বিচারের অত্যন্ত শক্তিশালী আ’লীগ। সেই সাথে নৌকার সাথে জড়িত আবেগ-ভালোবাসা। কে প্রার্থী তার, সেই প্রশ্নের চেয়ে বিবেচ্য নৌকা। নৌকা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই, থাকতে পারে প্রার্থী নিয়ে। কিন্তু নৌকার প্রার্থীও হেভিওয়েট, মন্ত্রীর হ্ওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন নিজ যোগ্যতায় তিনি। তার এই অর্জন এই আসনের মানুষের জন্য গৌরব ও অহংকারের। সেকারনে স্থানীয় আ’লীগ নৌকার বিজয় নিশ্চিতে ঐক্যবদ্ধ। সাজানো গোছনো নৌকার এ আসন, অন্য কারো হাতে তুলে দেয়া হলে, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিশ^াস হারাবে নির্বাচন কমিশন। কারন যোগ-বিয়োগ সকল অংকে নৌকার বিজয় নিশ্চিত। তার বিপরীত কোন কিছু হলে, নির্বাচন কমিশনের অবাধ সুষ্ঠ নির্বাচন প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে আ’লীগের নেতাকর্মীরা। গোলাপগঞ্জ পৌরমেয়র মো: আমিনুল ইসলাম রাবেল বলেন, অটো পাসের স্বপ্ন যারা দেখছেন তার ঘুমের ঘোরে আছেন। ব্যক্তি বিশেষের স্বার্থে অটো পাস ঘটনা, কোন দল বা দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা সর্বনাশ ছাড়া কিছু নয়। এ আসনে নৌকার দৌড়ে সাথে কারো পাল্লা দেয়ার সাধ্য নেই, কারন নৌকা স্বার্থে আ’লীগ তৃণমুলে এক ও ঐক্যবদ্ধ। কোন দুরভিসন্ধি কলা কৌশলে নৌকার বিজয় ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে, দল ্ও জনগন সর্বাবস্থায় রুখে দাঁড়াবে। এ আসনে অন্য প্রার্থীরা হচ্ছেন-জাতীয় পার্টির সেলিম উদ্দিন (লাঙ্গল), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের আতাউর রহমান আতা (ছড়ি) ও ইসলামী ঐক্যজোটের সাদিকুর রহমান (মিনার)।