Breaking News

স্বাধীনতার মাসে আবার ভুল করল বিএনপি!

বিষয়টি অনেকেরই দৃষ্টি আক’র্ষণ করেছিল। ১৯৭৫-এর নি’র্ম’ম হ’ত্যাকা’ণ্ডের পর প্রায় ৪৫ বছর পার করে বিএনপি নেতৃত্বের বোধোদয় হলো তারা ৭ মার্চের গুরুত্ব অনুধাবন করে দিনটি উদ্যাপন করবেন।

শুরুতে একটি হোঁচট খেয়েছিলাম পূর্বাপর ঘটনা ও বিএনপির এতকালের নীতি দেখে। কারণ, বাস্তবতা বিচার করে অনেকেই মানেন বঙ্গবন্ধুর বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের যেহেতু প্রত্যক্ষ সুবিধা লাভকারী ছিলেন জিয়াউর রহমান এবং ক্ষমতায় বসে

আত্মস্বীকৃত খু’নিদের রক্ষা ও পুরস্কৃত করার দায়িত্ব নিজহাতে গ্রহণ করেছিলেন তিনি, তাহলে তার দল কেমন করে ৭ মার্চ উদ্যাপন করে? কী উত্তর দেবেন মানুষের প্রশ্নের?

তবে আমি সব সময় প্রথমে ইতিবাচক দিক থেকে ভাবতে চাই। বিএনপি তো দীর্ঘদিন থেকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্দশাক্রান্ত। আমরা অনেকবার কাগজে লিখেছি সব ভুল সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে এসে আত্মশুদ্ধ হয়ে বিএনপি জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে ইতিবাচক রাজনীতি শুরু করুক।

সারা দেশে বিএনপির কর্মী কম থাকলেও অসংখ্য সমর্থক আছে। তাদের ঐক্যবদ্ধ করে রাজনীতির মাঠে আবার সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ রেখেছিলাম।১৯৯৭ সাল থেকে এনসিটিবির স্কুল পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে আপনারা যেভাবে ফরমায়েশি ইতিহাস লেখার যাত্রা শুরু করেছিলেন তা থেকে বেরিয়ে মানুষের আস্থায় ফিরে আসার চেষ্টা করুন।

দলীয় উপাধি নয়-লাখো জনতার উপস্থিতি ও অনুমোদনে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল। তাই ‘বঙ্গবন্ধু’ না-বলতে পারা জনগণকে অস্বীকার করার নামান্তর। অথচ বিএনপি আমলে স্কুল পাঠ্যবই থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ছেঁটে ফেলে দেওয়া হলো। যেসব ডি’গবাজি খাওয়া নেতা কিছুকাল আগেও ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে মুখে ফেনা তুলতেন,

তারা এরপর থেকে সতর্কভাবে তাদের বক্তৃতায় ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দ উচ্চারণ পরিহার করলেন। যেন ভুলেও বলে ফেললে রাজনীতির ‘চাকরি’টি হারাবেন! শেষ নিম্নমানের অন্যায়টি ছিল ইতিহাসের দীর্ঘ ধারাবাহিকতাকে অস্বীকার করে,মুক্তিযু’দ্ধের ইতিহাসকে আমলে না-এনে বেগম খালেদা জিয়ার রাজত্বকালে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করতে হঠাৎ কোনো রকম ল’জ্জিত না-হয়েই প্রচার করা ‘জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক।’

প্রথম যখন শুনেছিলাম তখন অন্য কারণে রাগ হয়েছিল এসব বিএনপি নেতার প্রতি। কারণ, বুঝে পাচ্ছিলাম-না কেন তারা জিয়াউর রহমানকে, অন্যতম সেক্টর কমান্ডার বীর মু’ক্তিযো’দ্ধা, রেডিও-টেলিভিশনের ঘোষণা পাঠকদের মর্যাদায় নামিয়ে আনলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে জনগণের কাছে অপরিচিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন মেজর সময়ের বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধুর পক্ষে একটি ১০ কিলোওয়াটের দুর্বল ট্রান্সমিটারে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলেন, যা খুব অল্পসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছতে পারল, আর এ কারণেই মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়ে মু’ক্তিযু’দ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল!

জিয়াউর রহমান স্বয়ং বেঁচে থাকতে অমন দাবি শুনলে ল’জ্জায় কুঁকড়ে যেতেন। কারণ, জীবদ্দশায় অমন দাবি তিনি করেননি। বরঞ্চ নিজের লেখায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। আর সে সময়ের ভুলের ধারাবাহিকতায় আরেকবার ভাগাড়ে পা রাখার মতো ভুল করল বিএনপি। হঠাৎ করেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে আড়াল করতে এবং সাধারণ মানুষ যাতে এ দিনটি তর্পণ করে ইতিহাসকে জীবন্ত করতে না-পারে, তাই অতীতের কোনো রেকর্ড না-থাকলেও বেগম খালেদা জিয়ার নবজন্ম দেওয়া হলো ১৫ আগস্ট।

রাজনীতি কতটা নিম্নমানের হতে পারে! ১৫ আগস্ট যখন জাতি শোক পালন করে, তখন সুখ ছড়িয়ে দেওয়ার আয়োজন করে বিএনপি। সুবেশী বেগম জিয়া বিশাল কেকের গায়ে ছুরি চালিয়ে নিজ বিশেষ জন্মদিনের ‘শুভ’ সূচনা করেন। বেশ কয়েক বছর এ নিম্নমানের আচরণ চলল। হালে পানি না-পেয়ে সম্ভবত এখন কিছুটা পিছু হটেছেন বিএনপির নেতারা। এহেন বিএনপি নেতৃত্বের এতকাল পর ঘটা করে ৭ মার্চ পালনের ঘোষণা কৌতূহলের উদ্রেক করবে বটে; অবশেষে ঝুলির বেড়াল ঠিকই উগরে দিলেন সর্বত্র বিএনপি নেতারা। সর্বত্র একসুরে আরেকবার নিম্নমানের রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে এলেন।

বোঝা গেল দলীয় সিদ্ধান্তে বেশ মহড়া করেই মাঠে নেমেছেন। এটিও বোঝা গেল বিএনপি নেতারা এ অপকর্ম করতে কোথাও থেকে আদিষ্ট হয়েছেন। বরাবরই বিএনপি নেতাদের পুতুল নাচের পুতুল বলেই মনে হয়। কী দুর্ভাগ্য, তাদের অদৃশ্য সুতার টানেই নাচতে হয়। ৭ মার্চ উদ্যাপনের মূল এজেন্ডা ছিল তাদের পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা। অর্থাৎ, ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণার কোনো কিছু নেই। তাই স্বাধীনতার ঘোষক হচ্ছেন জিয়াউর রহমান। এসব শুনে আমার দুটো কথা মনে হলো। প্রথম মনে হলো, বিএনপি সত্যিই ভীষণ বিপন্ন অবস্থায় পড়েছে। নীতিনির্ধারণে তাই স্থান-কাল বিবেচনা করতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, যে হাট জমাতে পারেনি তা ভেঙে গেছে অনেক আগেই। জিয়াউর রহমানকে মু’ক্তিযু’দ্ধের ঘোষক বলে নতুন প্রজন্মকে বি’ভ্রান্ত করার চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত সাফল্য পায়নি।

খোদ বিএনপি কর্মীদের অনেকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন। এরপর আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শা’সনামলে মুক্তিযু’দ্ধের পূর্বাপর ইতিহাস নানাভাবে নতুন প্রজন্মের সামনে চলে এসেছে। এ অবস্থায় ভুল আর কপট আচরণের জন্য বিএনপি নেতারা নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে করুণাই পেতে পারেন। কোনো লভ্যাংশ তুলে আনার সুযোগ নেই। এসব কারণে আমি খুব বিস্মিত তেলতেলে বাঁশ থেকে পিছলে নর্দমায় পড়ার অমন সিদ্ধান্ত কেমন করে নেতারা বহন করতে রাজি হলেন! পাঠক লক্ষ করেছেন নিশ্চয়ই, অতীতে বিএনপির হাতে গোনা কয়েকজন নেতা জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলার মতো মিথ্যাচার সযত্নে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন এবার তাদেরও কলের পুতুলের মতো আউড়ে যেতে হচ্ছে। বড় করুণা হয় এসব নেতার জন্য।

২০০৫ সালে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইতিহাস’ নামে একটি বই বেরিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে যেসব বেতারকর্মী যাত্রা শুরু করেছিলেন, তারা তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এ বইয়ে। এখানে কাজী হাবিব উদ্দিন আহমদ মনি লিখিত ‘আমি ও কালুরঘাট বেতার’ শিরোনামের স্মৃতিকথার একটি অংশ তুলে ধরতে চাই। তিনি লিখেছেন, ‘২৭ তারিখে আমরা সকালবেলা যখন অধিবেশন চালু করলাম সে সময় হঠাৎ করে লেফটেন্যান্ট শমসের এলেন একটি জিপে করে এবং জিপে তার পাশে বসা ছিলেন মেজর জিয়া। লেফটেন্যান্ট শমসের দারুণ সুদর্শন একজন ব্যক্তি ছিলেন-লম্বা, ফরসা-বেশ একটু বাচ্চা বয়সের।

আমার চেয়েও অনেক তরুণ মনে হচ্ছিল। তার পরনে ছিল খাকি পোশাক। আর মেজর জিয়া পায়ের সমস্যার কারণে একটু খোঁড়া ছিলেন। খোঁড়াতে খোঁড়াতে গাড়ি থেকে নামলেন এবং আমাদের ট্রান্সমিশন সেন্টারে ঢুকলেন। সেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং দপ্তর, টেবিল-চেয়ার আছে, সেখানে উনি এসে বসলেন। সেখানে বেলাল ভাই ও আমরা সবাই বসে কাজ করছিলাম। আমাদের মধ্যে যে ১০ জন ছিলাম সে ১০ জন হচ্ছেন: রেজাউল করিম, আমিনুর রহমান, রাশেদুল হাসান, সৈয়দ আবদুল শাকের, মোস্তফা আনোয়ার, আবদুল্লাহ আল ফারুক, বেলাল মোহাম্মদ, আমি (কাজি হাবিব উদ্দিন আহমেদ), শারফুজ্জামান, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ। আমরা ১০ জন ওই জায়গায় কর্মরত ছিলাম। এ কর্মরত অবস্থায় সামরিক বাহিনীর লোকদের পেয়ে আমরা সত্যিই নিজেদের গর্বিত মনে করছিলাম। অনুরোধ করলাম, আপনি একটি ভাষণ বা একটি কথিকা পাঠ করতে পারবেন যে, সারা দেশের সোলজার যারা আছেন, বাঙালি সোলজার যারা আছেন, তারা যেন সবাই আপনাদের মতো বেরিয়ে আসে, সে অনুরোধ করার জন্য। এরকম একটা ভাষণ আপনারা দেন। তিনি অনেক্ষণ ধরে চিন্তা করে শমসেরের সঙ্গে আলাপ করলেন, লেফটেন্যান্ট শমসের কী যেন ইংরেজিতে বলার পর আমাদের বললেন, ঠিক আছে কী পড়তে হবে আমাদের দেন,

আমরা দেখি কী করা যায়। আমরা ঠিক করে দিলাম কী বলতে হবে। ওনাকে বলেছি যে, আপনার নাম আপনি ব্যবহার করবেন, এতে আমরা কোনোরকম দ্বিধাবোধ করব না; কিন্তু এখানে একটি নাম ব্যবহার করতে হবে সেটি হচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমান। কারণ, শেখ মুজিবুর রহমানকে সারা পৃথিবীর মানুষ চেনে। জানে সারা বাংলাদেশের রাজনীতির যে পটপরিবর্তিত হচ্ছে সেটা শেখ মুজিবুর রহমানের কথার ওপর। কথা শোনার পর ওনারা অনেকক্ষণ পর্যন্ত গম্ভীর হয়ে রইলেন এবং প্রস্তুতি নিলেন। On behalf of Sheik Mujibur Rahman our… আমাদের ভীষণ ভালো লাগল। সঙ্গে সঙ্গেই তার ইংরেজি ভাষণটি বাংলায় অনুবাদ করে আমরা সবাই একবার একবার করে পড়তে লাগলাম। এটি পড়ে আমাদের দ্বিতীয় অধিবেশনটা আমরা দীর্ঘায়িত করলাম এবং তৃতীয় অধিবেশনে সম্পূর্ণভাবে এ ভাষণটি কয়েকবার পড়া হয়েছে যাতে সেনাবাহিনীর লোকেরা তা জানতে পারে। বিভিন্ন বিদেশি জাহাজের অ্যান্টেনার টাওয়ারকে বলেছি যে, আপনারা যেখানেই আমাদের সংবাদটা শুনতে পাবেন, সেখানেই সে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে আমাদের এ সংবাদটা পৌঁছে দেবেন। এ আবেদনটা আমরা বিভিন্ন বিদেশি জাহাজকে অনুরোধ করেছিলাম। হয়তো-বা কাজে লেগেছিল কিছুটা।’

আগেই বলা হয়েছে, এ সময় বাংলাদেশের মানুষের কাছে জিয়াউর রহমান পরিচিত কোনো ব্যক্তি ছিলেন না। বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। আর দশজন সেনা অফিসারের মতোই একজন অফিসার ছিলেন। তবুও জাতির এ ক্রান্তিকালে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে তার ঘোষণা পাঠ গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করে। পাকবাহিনী তাদের সামরিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে মানুষের দিশাহারা হয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক। তবুও অগ্নিম’ন্ত্রে দীক্ষিত বাঙালি সীমিত সাধ্য নিয়েই প্রতিরোধ যু’দ্ধ শুরু করে। এমন এক অবস্থায় মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণা পাঠ মানুষের মনোবল অনেকটা বাড়িয়ে দেয়। তারা জানতে পারে বাঙালি সেনারা মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত হয়েছে-নেতৃত্ব দিচ্ছে,- নিঃসন্দেহে তা মানুষকে উদ্দীপ্ত করে।ইতিহাসের এ সত্যটি সামনে নিয়েই বিএনপির এগোনো উচিত ছিল; কিন্তু বিএনপি ভুলের আবর্ত থেকে বেরোতে পারছে না। এবার ৭ মার্চ নিয়ে এতবড় ভুলের পরিকল্পনা করবে-এটি ভাবতে পারিনি। জানি-না এ দলটির নেতা-নেত্রীদের মধ্যে শুভচিন্তার উদয় হবে কি না! ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

About staff reporter

Check Also

আল জাজিরার রিপোর্ট বাংলায়- মোদিবিরোধী বিক্ষোভের পরে বাংলাদেশ ইসলামপন্থী দলটির বিরুদ্ধে

হেফাজতে ইসলামের প্রভাবশালী নেতা গত মাসে ভারতীয় নেতার সাক্ষাতকারের বিরুদ্ধে মারাত্মক বিক্ষোভের জন্য গ্রেপ্তার হওয়া …