Breaking News

পুরুষশূন্য গ্রাম, কেউ মারাও গেলে দাফন করার লোক খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না

শাল্লার নোয়াগাঁওয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি’ঘরে হা’ম’লার ঘটনায় দুটি মা’মলা হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুলের করা মাম’লায় ৮০ জনের নাম উল্লেখ করে অ’জ্ঞা’ত ১৪/১৫শ’ জনকে আসা’মি করা হয়েছে।

এদিকে পুলিশের করা মাম’লায় অ’জ্ঞা’ত দেড় হাজার জনকে আসা’মি করা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক অ’জ্ঞা’ত আসা’মি থাকায় কাশিপুর, নাচনী, চন্ডিপুর, ধনপুর, চন্দ্রপুর গ্রামের বৃদ্ধ যুবক তরুণ কিশোর সবাই গ্রে’প্তার আ’তং’কে আ’ত্ম’গো’পন করে আছেন।

সরজমিন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পুরুষশূন্য এসব গ্রামে বেশির ভাগই রিকশা শ্রমিক, দিনমজুর, ভ্যানচালক, জেলে ও বর্গাচাষী। অক্ষ’রজ্ঞানহীন পি’ছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। তারা দিন আনে দিন খায়। হতদরি’দ্র এসব পরিবারের উপার্জনক্ষ’ম ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে অসহায় হয়ে পড়েছেন নারী ও শিশুরা।

খাবারের অভাব, ভয় আর আ’তং’ক নিয়ে মানবেতর দিনানিপাত করছে ওই গ্রামগুলোর কয়েক হাজার নারী ও শিশু। কথা বলতে গেলেই তারা বিলাপ করে কাঁদছেন। এক ফসলি বোরো জমির ধান পাকতে শুরু করেছে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে শুরু হবে ধান কা’টা। দুশ্চিন্তা ভর করেছে হাওরের বোরো ফসল ঘরে ওঠানো নিয়ে।

গ্রামের মসজিদগুলোতে আজান দেয়া কিংবা কেউ মা’রা গেলে দা’ফন করার লোক খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গ্রামের মহিলারা জানান, পুলিশ যাকে পাচ্ছে তাকেই ধ’রে নিয়ে যাচ্ছে। তাই ভয়ে সব পুরুষ মানুষ পা’লিয়ে আছে।

খাবার ও চিকিৎসার অভাবে নারী শিশুদের বিলাপঃ দিরাই উপজেলার সরমঙ্গল ইউনিয়নের নাচনী ও চন্ডিপুর গ্রাম নিয়ে ৯ নং ওয়ার্ড। গ্রাম দুটিতে ৬ শতাধিক পরিবার বাস করে। এরমধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ পরিবারই হতদরিদ্র। দিনমজুরি আর বর্গা চাষ করে তাদের সংসার চলে। নাচনী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা শাহিদা বেগম ডোবা সেচ করে কাঁদা জলে মাছ ধরায় ব্যস্ত। প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি। পরিচয় দিতেই হাউমাউ করে কেঁ’দে ডা’ঙায় উঠলেন। তিনি বলেন, আমার পুত পালাইল (পা’লিয়ে) আছে। আমরার কোন আরস্তি নাই গিরস্তি নাই। আমরা আনিতে খাই, মাছ মারিতে খাই। অখন আমার পুত বাড়িত না। ডরাইয়া গেছেগি কুনানো (অজ্ঞাত স্থানে)। নিজের গায়ের কাঁদামাটি দেখিয়ে শাহিদা বলেন, অখন আমার ছোট ছোট ৬ জন নাতি-নাতলের কান্দনে আমি গিয়া গাতা (ডোবা) হিচ্ছিয়া (সেচ করে) দুইলা মাছ মারতাছি। আমি মাছ বেইচ্ছা নাতি-নাতলরে আইন্না খাবাইতাম। নিজেতো পেটের ভুকে (ক্ষুধা) কষ্ট কররাম। পুরুত্তায় (শিশু) তো বুঝে না। অনে কই যাইতাম, সোয়াসের চাউল কেউর গেছে পাইবার ক্ষেমতা নাই। মাছ ধররাম কিন্তু কার গেছে বেচমু, দেশও মানুষ নাই। অনে ভিক্ষা ছাড়া উপায় দেখরাম না। কথা বলার সময় শাহিদা বেগমের পুত্রবধূ পাশে দাড়িয়ে ঢুকরে কাঁদছিলেন।

গ্রেফতার আতংকে আত্মগোপন করে আছেন চন্ডিপুর গ্রামের শিউলি বেগমের স্বামী টিটু মিয়া। শিউলি বেগম বলেন, ‘আমার ৪টি মেয়ে ও শাশুড়িকে নিয়ে বর্তমানে খুবই বিপদের মধ্যে আছি। আমরা খানাপিনায় চিকিৎসায় কষ্ট পাইতেছি। কেউ কেউ দোষ করছে, কেউ দোষ করছে না। কিন্তু দোষী যারা নির্দোষ যারা সবাই শাস্তি ভোগ করতেছে। শাস্তি শুধু পুরুষরা পাইতাছে না। সবচে কষ্ট অইতেছে আমাদের। কারণ আমরা গ্রামের মেয়েরাতো হাটবাজারে যাইতে পারি না, হাটবাজার করতে পারি না। কোন দোকানপাট খোলা নাই, কোনকিছুই নাই। আমরা যেন একটা মরুভূমির মধ্যে আছি। পরিবারের তিনজন ডায়াবেটিস রোগী। করোনার সময়ে আমরা চিকিৎসা করাইতে পারতেছি না। আমাদের ফসল নষ্ট হইতেছে। সারা বছরে আমাদের একফসলির একটা এলাকা। এই ফসল ছাড়া আমাদের উপার্জনের আর কোন পথ নাই। এই কৃষির উপর আমরা নির্ভরশীল। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আমার স্বামী। তিনি কেঁদে প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য কামনা করে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি আমাদের বাঁচান। এভাবে চলতে থাকলে আমরা না খেয়ে মারা যাবো।

নোয়াগাঁওয়ে হামলা মামলার প্রধান আসামী স্থানীয় ইউপি সদস্য যুবলীগ নেতা স্বাধীন মেম্বার নাচনী গ্রামের বাসিন্দা। কথা হয় স্বাধীন মেম্বারের বৃদ্ধ মা খোদেজা বিবির সাথে। ঘরের বারন্দায় বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, আমার পুতেরা কোন দোষ করছে না। আমার পুতের কথায় আস্তা এলাকার মানুষ চলেনি।

স্বাধীন মেম্বারের ছোট ভাই আবদাল হোসেন (২৫) গত ২১ মার্চ দিরাই উপজেলার ধল ভড়াউট গ্রামে পালিয়ে থাকা অবস্থায় মারা যায় জানিয়ে তার মা বলেন, আমার পুত ডরাইয়া ভাইগ্গা গেছে। স্ট্রোক করছে। ডাক্তারে যাওয়ার মানুষ পাইছি না। আমার পুত মারা গেছে। পরে মাটি দিবার জায়গা নাই। হেরাও (ধল ভড়াইট গ্রামের লোকজন) ডরাইয়া কম্পমান। কাজমিতি (কাকুতিমিনতি) করার পরে ৪/৫ মানুষে লইয়া আইয়া পুরান বাঁশ, পুরান দাড়ি (পাটি) দিয়া মাটি দিছে। তিনি জানান, মাত্র ৬ মাস আগে আবদাল বিয়ে করেছিল। তার মৃত্যুর ৪/৫ দিন পরে পূত্রবধূ তার পিত্রালয়ে ফিরে গেছে।

নাচনী গ্রামের ইমাম হোসেনের স্ত্রী মাজেদা বেগম জানান, তার স্বামী সবজি বিক্রি করেন। ঘটনার দিন ইমাম হোসেন দিরাই বাজারে ছিলেন। তিনি দাবি করেন- তার স্বামী ওই ঘটনায় জড়িত না। একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি বাড়িতে না থাকায় ৪ শিশুসন্তান ও বৃদ্ধ শাশুড়িকে নিয়ে বিপদে আছেন। একই গ্রামের ৬ শিশুবাচ্চার মা শারবান বিবি জানান, স্বামীর অনুপস্থিতিতে তিনি মাটি কাটার কাজ করে সন্তানদের খাবার দিচ্ছেন।

একই ইউনিয়নের ধনপুর গ্রাম নিয়ে ৭ নং ওয়ার্ড। প্রায় ৪শ’ পরিবারের বাস। গ্রামে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, এক বৃদ্ধ মহিলা স্থানীয় ব্রাকের মাঠকর্মীর সাথে ঋণের কিস্তির টাকা নিয়ে দেনদরবার করছেন। কাছে গিয়ে জানা গেলো ধনপুর গ্রামের দুলাল মিয়ার স্ত্রী রতিমালা তিনি। বললেন, পরিবারে ১০ জন মানুষ। খাবারই পাচ্ছি না, কিস্তি কোথা থেকে দেবো। একই গ্রামের আরজ আলীর স্ত্রী আম্বিয়া জানালেন, ৭ শিশুবাচ্চা নিয়ে না খেয়ে আছেন। কোলের শিশু ফারদুল্লা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। ওষুধ কেনার টাকা নাই, ঘরে কোন খাবার নাই। তিনি বলেন, সকালে প্রতিবেশী কিছু ভাত দিয়েছিল, সেটাই বাচ্চাদের খাওয়াইছি। আবার কিভাবে দেবো জানি না। এসময় তিনিও কাঁদছিলেন। বৃদ্ধা মোমিনা খাতুন জানান, তার ৪টি গরুর মধ্যে একটি ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

আরেকটি গরু নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে। গবাদিপশুকে চিকিৎসা করানোর লোক নেই। বৃদ্ধা নিজের গোয়ালঘরে বেঁেধ রাখা গবাদিপশু পশু দেখিয়ে বলেন, দিনের বেলাও সবার গরু গোয়াল ঘরে। মাঠে নিয়ে যাবার মতো লোক নেই। ৩ শিশু সন্তানের মা সুজিতা জানান, নোয়াগাঁওয়ে ঘটনার দিন তার স্বামী প্রতিদিনকার মতো দিরাই শহরে রিকশা চালানোতে ছিলো। এখন সেও গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে আছে। শাল্লা উপজেলার কাশিপুর গ্রামের জাসদ মিয়ার স্ত্রী ফুলেছা বেগম জানান, স্বামীর অনুপস্থিতিতে ৬ মেয়েশিশু ও শাশুড়ি নিয়ে তিনি অনাহারে আছেন। একই চিত্র দেখা গেছে দিরাই উপজেলার ধনপুর, চন্ডিপুর, নাচনী, চন্দ্রপুর ও শাল্লা উপজেলার কাশিপুর গ্রামের প্রায় প্রতি ঘরে ঘরে।

About staff reporter

Check Also

মন্ত্রী ভুয়া লকডাউন দিছে-মানুষ খাবে কি ?লাইভ টেলিকাস্টে পথ শিশু

করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি বিবেচনায় চলমান সর্বাত্মক লকডাউন আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এদিকে লকডাউন …