Breaking News

১৯৭১ ও ১৯৪৭ এর পর এই কালে বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা – বিদায় হওয়াদের মনে রাখছে কজনে

আজিজুল পারভেজ একের পর এক খসে পড়ছে উজ্জ্বল সব তারকা। সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা ছিলেন মহীরুহসম। অধ্যাপক শামসুজ্জামান খানের মতো কীর্তিমান ফোকলোর গবেষক, কবরীর মতো কিংবদন্তি নায়িকা, ওয়াসিমের মতো সুপারহিট নায়ক, ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর মতো জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী, এস এম মহসীনের মতো নাট্যব্যক্তিত্ব,

অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমানের মতো বিশ্লেষক-গবেষক, মিতা হকের মতো গুণী শিল্পী-সংগঠক, হাসান শাহরিয়ারের মতো কৃতী সাংবাদিক, আবদুল মতিন খসরুর মতো প্রজ্ঞাবান আইনজীবী ও বিনয়ী রাজনীতিবিদ, সাজেদুল আউয়ালের মতো নিবেদিত চলচ্চিত্র গবেষক, ড. এ কে এম রফিক আহাম্মদের মতো প্রশাসনিক কর্মকর্তা (পরিবেশ অধিদপ্তরের ডিজি) মারা গেছেন গত দুই সপ্তাহে।

যেন কীর্তিমানদের মৃত্যুমিছিল শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ওয়াসিমের মৃত্যু বার্ধক্যের কারণে আর তারেক শামসুর রেহমানের মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অন্যদের কেড়ে নিয়েছে করোনা। এ বছরের প্রথম তিন মাসে মারা গেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ,

লেখক-গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ, ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন, নারী নেত্রী আয়শা খানম, সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান, অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান, কণ্ঠশিল্পী জানে আলম, জনকণ্ঠ সম্পাদক আতিকউল্লাহ খান মাসুদ, এনজিও আশার চেয়ারম্যান সফিকুল হক চৌধুরী, মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েস এমপি, মুক্তিযোদ্ধা-অভিনেতা মজিবুর রহমান দিলু, লেখক খন্দকার মাহমুদুল হাসান, চিত্রশিল্পী সৈয়দ লুত্ফুল হকের মতো কীর্তিমানরা। এর মধ্যে এইচ টি ইমাম, রাবেয়া খাতুন ও এ টি এম শামসুজ্জামানের মৃত্যু বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায়; সফিকুল হক হৃদরোগে, সৈয়দ আবুল মকসুদ ও আতিকউল্লাহ খান মাসুদ আকস্মিক শ্বাসকষ্টে এবং মওদুদ আহমদ ও খন্দকার মাহমুদুল হাসান শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে মারা গেছেন। অন্যদের মৃত্যু করোনাভাইরাসে। স্বল্পতম সময়ে এত এত গুণী ও আলোকিত মানুষের মৃত্যু মুক্তিযুদ্ধের পর আর ঘটেনি।

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর গত বছর থেকে মৃত্যুমিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। স্বজন হারানোর বেদনা আর দীর্ঘশ্বাসে ভারী হচ্ছে বিমর্ষ পৃথিবী। প্রতিদিন ঘুম ভাঙছে মরণের আহাজারি শুনে। সবখানে চলছে মৃত্যুর আতঙ্ক আর হাহাকার।

মানুষ মরণশীল, মৃত্যু ঘটবেই। কিন্তু এই প্রাকৃতিক নিয়মকে ত্বরান্বিত করেছে করোনাভাইরাস। আকস্মিক মৃত্যুতে একটি প্রজন্মই যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা। বেশির ভাগ মারা যাচ্ছে করোনাভাইরাস সংক্রমণে কিংবা সংক্রমণ-পরবর্তী জটিলতায়। করোনা সংক্রমিত না হয়েও কেউ কেউ মারা যাচ্ছেন। তবে তাঁদের মৃত্যুও করোনারই অভিঘাতে হচ্ছে বলে ধারণা। কারো কারো ক্ষেত্রে যথাসময়ে পরীক্ষা না হওয়ার কারণে করোনা শনাক্ত হচ্ছে না।

দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু শুরু হয় গত বছরের ১৮ মার্চ। এরপর গতকাল পর্যন্ত মারা গেছে ১০ হাজার ৬৮৩ জন।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত বছর ২৮ এপ্রিল মারা যান সাংবাদিক হুমায়ুন কবির খোকন। এরপর গতকাল পর্যন্ত এক বছরে মারা গেছেন ৩৭ জন সাংবাদিক। করোনার উপসর্গ নিয়ে ১৪ জন মারা গেছেন বলে ফেসবুক গ্রুপ ‘আমাদের গণমাধ্যম, আমাদের অধিকার’ জানিয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী, দৈনিক সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামান, আজকের সূর্যোদয় সম্পাদক খন্দকার মোজাম্মেল হোসেন, সিলেটের দৈনিক উত্তর পূর্বের সম্পাদক আজিজ আহমদ সেলিম প্রমুখ।

চিকিৎসকদের মধ্যে করোনায় গত বছরের ১৫ এপ্রিল প্রথম মারা যান সিলেটের ডা. মঈন উদ্দীন আহমদ। এরপর গতকাল পর্যন্ত মারা গেছেন ১৪৭ জন চিকিৎসক।

করোনা আক্রান্ত হয়ে গত ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত প্রশাসনের ২৫ জন কর্মকর্তা মারা গেছেন। এর মধ্যে রয়েছেন প্রতিরক্ষা সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী। গতকাল পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসনে মারা গেছেন ৯১ জন।

কীর্তিমানদের মধ্যে ২০২০ সালে যাঁদের হারিয়েছি তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ নাসিম, সাহারা খাতুন, শাজাহান সিরাজ, সাবেক ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহ, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন প্রমুখ।

ব্যবসায়ীদের মধ্যে মারা গেছেন ট্রান্সকম চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান, যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল, পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ হাসেম, শিল্পগোষ্ঠী আবদুল মোনেম লিমিটেডের (এএমএল) প্রতিষ্ঠাতা আবদুল মোনেম, এস আলম গ্রুপের পরিচালক মোরশেদুল আলম প্রমুখ।

শিল্প-সাহিত্যের গুণীজনদের মধ্যে যাঁদের হারিয়েছি তাঁরা হলেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর, চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, কবি ও গবেষক মনজুরে মওলা, কবি বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, রশীদ হায়দার, সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক রাহাত খান, সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাত প্রমুখ।

দেশবরেণ্য মানুষের মধ্যে হারিয়েছি জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, ভাষাসংগ্রামী ডা. সাঈদ হায়দার, ডা. মির্জা জলিল, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. এমাজউদ্দীন আহমদ, শিক্ষাবিদ সুফিয়া আহমেদ, বিজ্ঞানী ড. আলী আসগর, সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ড. সা’দত হুসাইন, সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরী, সি আর দত্ত, প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার নুরুল হক মানিক প্রমুখ।

সংস্কৃতি ও বিনোদন জগতে হারিয়েছি ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান, সুরকার আজাদ রহমান, আলাউদ্দিন আলী, অভিনেতা আলী যাকের, সংগীতশিল্পী এন্ড্রু কিশোর, কে এস ফিরোজ, আবদুল কাদের, নাট্যকার মান্নান হীরা, চলচ্চিত্র পরিচালক মহিউদ্দিন ফারুক প্রমুখকে।

এ দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা দেখা দিয়েছিল এর আগে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের হ’ত্যা করেছিল বেছে বেছে। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে তাঁদের শূন্যতা বিরাজ করেছিল দীর্ঘদিন। তারও আগে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের কালে এ দেশের অগ্রসর জনগোষ্ঠীর বিপুল অংশ দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ক্রেডিট কালের কণ্ঠ

About Tahsin Rahman

Check Also

শনিবার থেকে দিনে ফেরি চলাচল বন্ধ

করোনা বিস্তার রোধে সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক শনিবার (৮ মে) থেকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে দিনের …