৬ দিনেও খোঁজ মেলেনি পদ্মা সেতু থেকে ‘ঝাঁপ দেওয়া’ নুরুজ্জামানের, স্বজনরা করছেন ভিন্ন দাবি

চলন্ত প্রাইভেটকারের দরজা খুলে পদ্মা সেতু থেকে নদীতে ‘ঝাঁপ দেওয়া’ পোশাক শ্রমিক নুরুজ্জামানের (৩৮) খোঁজ ছয় দিনেও মেলেনি।

তার সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। স্বজনদের দাবি, তাকে হত্যার পর সেতু থেকে ফেলে আত্মহত্যা বলে প্রচার করা হচ্ছে।

নুরুজ্জামান ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার চুড়ালি গ্রামের আব্দুল মালেক ও হেলেনা দম্পতির ছেলে। তারা চার ভাই ও তিন বোন। ২০ বছর ধরে

নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। সেখানেই বিয়ে করেন সফুরা আক্তারকে। তিনিও পোশাক শ্রমিক। তারা দুই সন্তান নিয়ে একসঙ্গে বসবাস করতেন।

গত ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কবর জিয়ারত করতে না পেরে ক্ষোভে পদ্মা সেতু থেকে ঝাঁপ দেন নুরুজ্জামান।

এরপর থেকে তার খোঁজ মেলেনি। ঝাঁপ দেওয়ার আগে একটি ভিডিওতে নুরুজ্জামান খানের দেওয়া বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে প্রাইভেটকার ভাড়া করে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন নুরুজ্জামান। তারপর সেখানে

তাদের কাছে কার্ড না থাকায় ফুল দিতে পারেননি। ফেরার পথে ওইদিন দুপুর আড়াইটার দিকে পদ্মা সেতুতে অবস্থানকালে নুরুজ্জামান সেতু থেকে ঝাঁপ দেন। এরপর আর খোঁজ মেলেনি।

নুরুজ্জামানকে হত্যার পর গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে দাবি করে চাচা আব্দুল হান্নান বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো। সবাইকে বোঝাতো, আত্মহত্যা মহাপাপ। সেই নুরুজ্জামান কীভাবে আত্মহত্যা করলো? সে আত্মহত্যা করতে পারে না। তাকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর পদ্মা সেতু থেকে ফেলে আত্মহত্যা বলে প্রচার চালানো হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভিডিওটা দেখলেই বোঝা যায়, তাকে মেরে পদ্মা সেতু থেকে ফেলা হয়েছে। পড়ার পর কিন্তু গাড়ি থেকে কেউ বের হয়নি। এতেই স্পষ্ট যে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। তাছাড়া, একটা মানুষ ঝাঁপ দিলে যেভাবে পড়ে নুরুজ্জামান সেভাবে পড়েনি। মনে হয়েছে যেন একটি মূর্তি ফেলে দেওয়া হয়েছে। আমরা মরদেহটা চাই এবং হত্যাকারীদের বিচার চাই।’

মা হেলেনা বেগম বলেন, ‘নুরুজ্জামানের স্ত্রী, তার বোন, তার জামাই ও ছেলেকে নিয়ে আমার নুরুজ্জামানকে মেরে ফেলছে। জমি নিয়ে তাদের সঙ্গে ঝামেলা ছিল। তাই, আমার ছেলেকে মেরে ফেলছে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’ নুরুজ্জামানের ভাই আবুল কাশেম বলেন, ‘১৫ আগস্ট আমার ভাই পদ্মা সেতু থেকে লাফ দিয়েছে খবর পেয়ে ওই দিন মধ্যরাতে তাদের বাসায় যাই। সেখানে গিয়ে নুরুজ্জামানের স্ত্রী সফুরা ও তার দুই মেয়েকে ঘুমন্ত অবস্থায় পাই। দরজায় প্রায় আধাঘণ্টা ধাক্কাধাক্কি করার পর সফুরা দরজা খোলে। পরে তাকে, দুই ভাতিজি, সফুরার বোন ও তার জামাই ফজলুল হক এবং তাদের ছেলে মোজ্জাম্মেল হককে নিয়ে পদ্মা সেতু এলাকার থানায় যাই। সেখানে গিয়ে ওই গাড়িচালক ও নুরুজ্জামানের সঙ্গে থাকা ফারুক মিয়াসহ দুইজনকে পুলিশ আটক করেছে বলে জানতে পারি। পরে এ বিষয়ে আমরা থানায় অভিযোগ করতে চাইলে পুলিশ বাদী হয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফারুকের আত্মীয়রা তাকে ছাড়িয়ে আনতে যান। তবে পুলিশ তাকে ছাড়েনি। এসব করতে করতেই রাত হয়ে যায়। পরে ফেরার সময় আমার ভাবি ও দুই ভাতিজিকে খুঁজে পাইনি। তারা ফারুকের আত্মীয়দের সঙ্গে আমাকে রেখেই চলে আসে। এ অবস্থায় ভাবিকে ফোন দিয়ে বলি, আমি সবার নামে মামলা করবো। পরে ভাবি ওই গাড়ি থেকে নেমে দুই ভাতিজিকে নিয়ে আমার সঙ্গে আসে।’

আবুল কাশেম বলেন, ‘জমি নিয়ে সফুরার বোন, তার জামাই ফজলুল হক এবং তাদের ছেলে মোজাম্মেলের ঝামেলা চলে আসছিল। ছয় লাখ টাকায় দুই কাঠা জমি আমার ভাই নুরুজ্জামানকে লিখে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু লিখে দেয়নি। এসব নিয়েই তাদের সঙ্গে বিরোধ চলে আসছিল। এই বিরোধের কারণেই তারা আমার ভাইকে মেরে পদ্মা সেতু থেকে ফেলে দিয়েছে। আমরা চাই, সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হোক।’ এ বিষয়ে সফুরা আক্তার বলেন, ‘সে (নুরুজ্জামান) বঙ্গবন্ধুর করব জিয়ারত করতে যাবে, বিষয়টি আমি জানতাম না। সকালে উঠে আমাকে ঘুমে রেখেই চলে যায়। পরে তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়নি। সে আত্মহত্যা করছে নাকি মারা গেছে, ভিডিওতে সবাই যা দেখেছে, আমিও তাই দেখেছি।’ মাওয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ অহিদুজ্জামান বলেন, ‘নুরুজ্জামান নিখোঁজের পরদিন লৌহজং থানায় একটি মামলা করা হয়। আমাদের টিম নদীতে এখনও খোঁজাখুঁজি অব্যাহত রেখেছে। আমি এখন মাঝিরঘাটে আছি। আমাদের পুলিশের দিক থেকে সর্বাত্মক নদীতে টহল দিচ্ছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.