নির্বাচন নিয়ে যে ১০ সিদ্ধান্ত নিলো ইসি

রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাওয়া সুপারিশ পর্যালোচনা করে ১০টি সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)

আজ সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলকে সংলাপের আমন্ত্রণ জানানো হয়। ১৭ জুলাই থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ২৮টি দল সংলাপে অংশগ্রহণ করেছে।

আবেদনের ভিত্তিতে দুটি দলকে আগামী সেপ্টেম্বরে সংলাপে অংশ গ্রহণের জন্য সম্মতি দেওয়া হয়েছে। বিএনপিসহ ৯টি দল সংলাপে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থেকেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাওয়া সুপারিশ পর্যালোচনা করে ১০টি সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

ইসির সিদ্ধান্তগুলো হলো- ১. সকল দল বিশেষ করে প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের মতামত হচ্ছে, কমিশন নির্বাচনে সকল দলের বিশেষত প্রধানতম রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্তরিকভাবে প্রত্যাশা করে। নির্বাচন কমিশন কোনো দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করতে পারে না এবং সে ধরনের কোনো প্রয়াস নির্বাচন কমিশন গ্রহণ করবে না। তবে সকল দলকে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার আহ্বান শেষ পর্যন্ত আন্তরিকভাবেই বহাল থাকবে।

২. সঠিক ফলাফল নিশ্চিতকরণ, পেশিশক্তি প্রতিরোধ ও রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ সংক্রান্ত দলগুলোর প্রস্তাবের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য হচ্ছে, সংবিধান, আইন ও বিধি-বিধানের অধীনে প্রদত্ত সকল ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগ করে ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগে সৃষ্ট সকল বাধা ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রতিষ্ঠা করে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগের অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ সৃষ্টি করতে কমিশন সব উদ্যোগ গ্রহণ করবে। সেই সঙ্গে কারচুপির সম্ভাব্য সকল সুযোগ প্রতিরোধ করে সঠিক ও নিরপেক্ষ ফলাফল নিশ্চিত করতে সততা, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কমিশন কাজ করে যাবে।

নির্বাচনে জয়-পরাজয় অনিবার্য। প্রার্থীদের জয়-পরাজয় মেনে নিতে হবে। পরাজয় মেনে না নেওয়ার মানসিকতা পরিত্যাগ করতে হবে।

প্রার্থীরা প্রতিটি কেন্দ্রে কর্মী রেখে সক্রিয়ভাবে প্রতিটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে সৃষ্ট ভারসাম্য অর্থশক্তি ও পেশিশক্তির ব্যবহার ও প্রভাব অনেকাংশে প্রতিরোধ করে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।

৩. ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত সুপারিশের ক্ষেত্রে কমিশন সিদ্ধান্ত হলো- দেশি এবং বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের ভোট পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া হবে। ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগ অবাধ, নির্বিঘ্ন, স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান করতে ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরে সিসি ক্যামেরা প্রতিস্থাপন করে ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরভাগের দৃশ্য বাহির থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ, সামর্থ্য সাপেক্ষে দেওয়া হবে।

৪. একাধিক দিনে নির্বাচন ও সেনা নিয়োগের বিষয়ে সিইসি বলেছেন- একাধিক দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার বিষয়টি নিয়ে কমিশনের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আলোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে কিনা, হলে তা কীভাবে সম্ভব হবে, দিনের ফলাফল দিনশেষে প্রকাশ করা হবে কিনা, করা হলে তা পরের নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে কিনা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজন রয়েছে।

দেশে একই দিনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হয় বিধায় প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকাজে নিয়োজিত অসামরিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যা অপর্যাপ্ত বা অপ্রতুল হতে পারে। একারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকাজে সেনা মোতায়েনের প্রস্তাবনাটি যৌক্তিক বলে কমিশন মনে করে।

৫. ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) বিষয়ে কমিশন মনে করে- ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি এবং সমর্থন দুই-ই রয়েছে। কমিশন তা শ্রবণ করেছে এবং মতবিনিময় করেছে। ইভিএম-এর ব্যবহার নিয়ে ইতোপূর্বে সকল দলের (কতিপয় দল অংশগ্রহণ করেনি) আমন্ত্রিত প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সংলাপ ও কর্মশালা করা হয়েছে।

এছাড়া বুয়েটসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি বিষয়ে সর্বজনবিদিত বিশিষ্ট অধ্যাপকদের অংশগ্রহণে একাধিক সংলাপ ও কর্মশালা করা হয়েছে। যেহেতু সদ্য সমাপ্ত রাজনৈতিক সংলাপ ছাড়াও ইতিপূর্বে ইভিএম নিয়ে আরো সংলাপ, কর্মশালা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে এবং যেহেতু কমিশন ইভিএম-এর সার্বিক বিষয়ে এখনো স্থির কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। এটি নিয়ে কর্মশালা, মতবিনিময়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে তার সার্বিক ফলাফল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিচার-বিশ্লেষণ করে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম-এর ব্যবহার বিষয়ে কমিশন যথাসময়ে অবহিত করবে।

ব্লক চেইন পদ্ধতিতে বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসে ই-ভোট প্রদানের প্রস্তাবটি আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রয়োগ সম্ভব নয়।

৬. অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিল, এক মঞ্চে প্রচার ও ঋণ খেলাপির বিষয়ে সিইসি তার প্রতিবেদনে বলেছেন- অনলাইনে নমিনেশন পেপার দাখিল গ্রহণের সুযোগ বা বিধান বর্তমানে আরপিওতে রয়েছে। একই মঞ্চ থেকে সকল দলের প্রার্থীদের বক্তব্য দানের এবং প্রচারণার নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করার, নির্ধারিত স্থানে সকল প্রার্থীর পোস্টার লাগানোর ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনে একই পোস্টারে সকল প্রার্থীর প্রচারণার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব আধুনিক। এতে নির্বাচনী ব্যয় কমে আসতে পারে। নির্বাচনী সহিংসতা হ্রাস পেতে পারে। রাজনীতিতে সম্প্রীতির নতুন সংস্কৃতির প্রচলন হতে পারে।

ইউটিলিটি বিল বাকি থাকার কারণে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য বিষয়ক বিধানটি যৌক্তিক করার বিষয়ে কমিশন বিবেচনা করবে।

৭. নির্বাচনকালীন সরকার সংশ্লিষ্ট সংলাপে আসা সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে সিইসি বলেন, নির্বাচন কমিশন মনে করে নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রয়োজনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রাণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করার বিষয়টিও সংবিধানের আলোকে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। তবে, কমিশন মনে করে অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও সহিংসতা-বিবর্জিত নির্বাচনের প্রয়োজনে গণপ্রতিনিধিত্ব আইনে যে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর ওপর কমিশনকে দেওয়া আছে। সেগুলোর প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষ অবহিত ও সচেতন থাকবে এবং কোনো মহল থেকে সেগুলোর প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা বা বাধা সৃষ্টি যাতে না করা হয়, সংশ্লিষ্ট সকল নির্বাহী বিভাগকে সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব হিসেবে সেগুলো নিশ্চিত করতে হবে।

৮. ক্ষমতাসীন দলের বাধা, মিথ্য মামলার বিষয়ে কমিশন মনে করে সাধারণ মানুষদের মধ্যে এমন একটি ধারণা বা বিশ্বাস প্রবল। কমিশন দৃঢ়ভাবে আরও বিশ্বাস করতে চায় সরকারি দল এ ধরনের নির্বাচন আচরণ বিধি ভাঙার মতো কাজ থেকে বিরত থাকবে এবং রাজনৈতিক কারণে কোনো মামলা করে সুস্থ গণতন্ত্র চর্চার পথ বন্ধ করবে না। এক্ষেত্রে নির্বাচনকালীন সময়ে সকল অংশীজনের কার্যকলাপ কমিশন গভীর পর্যবেক্ষণে রাখবে।

৯. সংখ্যানুপাতিক সংসদীয় ব্যবস্থার সুপারিশের বিষয়ে সিইসি জানান, কমিশন পরামর্শটি গুরুত্বসহকারে শ্রবণ ও বিবেচনা করেছে। তবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ও দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠন করা, সংসদ সদস্যের সংখ্যা বর্ধিত করা এবং নারী আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তাবনাটি দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সরকার এবং জাতীয় সংসদের এখতিয়ারাধীন বলে কমিশন মনে করে।

১০. ক্ষমতা প্রয়োগের সুপারিশের বিষয়ে কমিশন বরাবরের মতো প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বলতে চায় যে, সংবিধানের অধীন গৃহীত শপথের প্রতি অনুগত থেকে সৎ, নিরেপক্ষ ও সাহসিকতার সঙ্গে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে সংবিধান ও আইনে প্রদত্ত ক্ষমতা সততা ও সাহসিকতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে বদ্ধপরিকর

Leave a Reply

Your email address will not be published.