আমি ব্লাউজ ছাড়া শাড়ী পরেছি, এটার আইডিয়া আমার এসেছে, আমি আমার দাদুকে দেখেছি

সংবাদঃ পোশাকের বৈচিত্র্যতাকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে একদল শিক্ষার্থী। ‌‘বৈচিত্র্যই সাধারণ, বৈচিত্র্যই বাংলাদেশ’ ব্যানারে বৃহস্পতিবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকেল পৌনে ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এ কর্মসূচি পালিত হয়।

আয়োজকরা এ কর্মসূচির নাম দিয়েছেন ‘যেমন খুশি তেমন পরো’ আয়োজন। আয়োজনে অংশগ্রহণকারী সকলেই তাদের পছন্দের পোশাক পরে রাজু ভাস্কর্যে অবস্থান নেয়। তাদের উদ্দেশ্য বৈচিত্র্যময় এবং অযাচিত খবরদারিহীন বাংলাদেশের প্রতিরূপ তুলে ধরা।

এক সপ্তাহ আগে পোশাক নিয়ে উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণের সমর্থনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী মানববন্ধন করেছিলো। মূলত এর প্রতিবাদেই তাদের এ অবস্থান কর্মসূচি বলে জানা যায়।

অবস্থান কর্মসূচি থেকে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান এদেশের সকল মানুষকে অধিকার দিয়েছে, জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো যেমন, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা নিজের ইচ্ছামতো, সাধ্যমতো এবং আইনানুযায়ী বেছে নেওয়ার।

সেই হিসাবে একজন নারী, পুরুষ বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে তার পছন্দসই পোশাক পরে দেশের যে কোনো স্থানে চলাচল করার। কিন্তু বাস্তবতা অন্য কথা বলে। নিজের পছন্দসই পোশাক পরার জন্য এদেশের রেল স্টেশনে এদেশেরই এক স্বাধীন নাগরিকের উপর হামলা হয়, বাসে টিশার্ট পরার জন্য অকথ্য গালিগালাজ শুনতে হয়।

তারচেয়েও ভয়ঙ্কর বিষয়, এসব করার পেছনের যৌক্তিকতা হিসাবে এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কার্যক্রম উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুলভাবে উপস্থাপন করার প্রবণতা। তারা আরও বলেন, শাড়ি, লুঙ্গি, পাজামা-পাঞ্জাবি, সালোয়ার কামিজ, স্কার্ট, ওয়েস্টার্ন, বোরকা, থামি সহ সকল আদিবাসী পোশাক আমাদের পোশাক।

নিজের চোখে যে পোশাক মানানসই, তার ব্যতিক্রম অন্যের পোশাকে দেখলে আক্রমণের যে প্রবণতা শুরু হয়েছে তার বিরুদ্ধে আমরা। আরো লজ্জার বিষয়, যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ তৈরি করার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই কিছু বর্তমান শিক্ষার্থীকে পোশাকের স্বাধীনতা তথা জীবনযাপনের স্বাধীনতার উপর আক্রমণকে সাধুবাদ জানাতে দেখা।

নিজের পছন্দকেই ‘দেশীয় মূল্যবোধ’ এর সর্বোচ্চ স্ট্যান্ডার্ড ধরা, আর এদেশেরই আরেকজন স্বাধীন নাগরিকের পছন্দকে খারিজ করে দেওয়ার যে ‘নাৎসিবাদই প্রবণতা’ তার বিরুদ্ধেই আমাদের আজকের আয়োজন।

মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতি সদা-পরিবর্তনশীল। আজ থেকে ১০১ বছর আগে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করেছিল, তখন সেখানে নারী শিক্ষার্থী ছিল একজন। এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা আলাদা করে গুণতে হয় না। অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ না করার যে দেশীয় মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতি পূর্বে ছিল তা পরিবর্তন হয়েছে, সময়ের সাথে, মানসিকতার সাথে। আমরা এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাই।

অন্যের স্বাধীনতার উপর খবরদারি না করে, নিজের স্বাধীনতা চর্চার মাধ্যমে সমাজে যে পরিবর্তন আসে, এর পক্ষে নিজেদের অবস্থান উল্লেখ করে তারা বলেন, ব্যক্তিস্বাধীনতার অভিব্যক্তি যতো শক্তিশালী হচ্ছে, সমাজ ততো বৈচিত্র্যময় হচ্ছে। এই বৈচিত্র্যে যেমন রয়েছে ধর্মীয় পোশাক, ঠিক ততোটাই রয়েছে তথাকথিত পাশ্চাত্য পোশাক। একটির বিরুদ্ধে অন্যটিকে ব্যবহার করা এবং তার মাধ্যমে এদেশের একজন স্বাধীন নাগরিককে হেনস্তা করা এবং তার ফলাফলে স্বাধীনতার উল্টো ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ তৈরি করা, এই পুরো প্রক্রিয়ার তীব্র নিন্দা আমরা জানাই। এর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে আমরা পোশাকের বৈচিত্র্যতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে চাই।

এ সময় একজন বলেন দাদুর কাছে থেকে ব্লাউজ ছাড়া শাড়ী পরার আইডিয়া নিছি, আমি ব্লাউজ ছাড়া শাড়ী পরে আসেছি। এটার আইডিয়া আমার এসেছে, আমি আমার দাদুকে দেখেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.