হঠাৎ কি হলো, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের দুই দিন পরই নতুন সিদ্ধান্ত নিলেন সিইসি

রাজনীতি: ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নিয়ে বিতর্ক বহুদিনের। বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকরা ইভিএম’র পক্ষে নয়।

এমন পরিস্থিতিতে ইভিএম এ আস্থা ফেরাতে নানা উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন। গত কয়েকমাস আগে থেকেই ইভিএম যাচাই করতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। তাতেও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।

আগে যে দলগুলো ইভিএমের বিপক্ষে ছিলো, তারা অবস্থান পাল্টায়নি। কিন্তু অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ইভিএমে আপত্তি জানালেও হাল ছাড়তে নারাজ ইসি। আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে চায় তারা। নির্বাচন কমিশন বলছে,

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে ব্যালটের চেয়ে ইভিএম এগিয়ে থাকবে। এদিকে অধিকাংশের আপত্তি সত্ত্বেও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কমিশনের অতি উৎসাহ ভাবাচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

যারা ইভিএম-এর বিপক্ষে তাদের দাবি এই মেশিনের মাধ্যমে ভোট হলে ভোটে দুর্নীতি হবেই। এসকল বিষয় নিয়ে এবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের ভেরিফাইড পেজে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আসিফ নজরুল। যা মূহুর্তেই ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে। আসিফ নজরুলের দেয়া স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হল,

আসিফ নজরুল বলেছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হাবিবুল আউয়ালের শুরুটা খারাপ ছিল না। কমিশনের দায়িত্ব নিয়ে তিনি সবার সঙ্গে সংলাপ শুরু করেন। এমন সংলাপ অবশ্য এ সরকারের আমলে আগেও হয়েছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সংবিধান সংশোধনী কমিটি, নির্বাচন কমিশন, বাছাই কমিটি—সবাই সংলাপ করেছেন। এসব সংলাপে তাঁরা সব রাজনৈতিক দলকে ডেকেছেন, সবার কথা শুনেছেন,

কিন্তু সিদ্ধান্তটা নিয়েছেন নিজের মতো করে। কাজেই সিইসির সংলাপে ভিন্ন কিছু হয় কি না, তা দেখার আগ্রহ ছিল মানুষের মধ্যে। সিইসি মাঝেমধ্যে আশা জাগানোর মতো কথা বলতেন। মার্চে নাগরিক সমাজের সঙ্গে সংলাপের সময় তাঁকে প্রায় সবাই ইভিএম দিয়ে নির্বাচন না করানোর জন্য বলেছিলেন। আলোচনা শেষে সিইসি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘ইভিএম ব্যবহারে অনেকেই অভ্যস্ত নয়। মেশিনের মাধ্যমে কোনো ডিজিটাল কারচুপি হয় কি না, পৃথিবীর অনেক দেশ ইভিএম বাতিল করে দিয়েছে, কেন করল সেটা গবেষণা করা উচিতও বলে অনেকে মতামত দিয়েছেন। এ ছাড়া যদি কোনো রকমে কারচুপি হয়ে থাকে, তাহলে রিকাউন্টিং করা যাবে কি না, এটার কোনো ব্যবস্থা আছে কি না, তা–ও আমাদের বুঝতে হবে।’

এ সংলাপ আরও কিছুদিন চলার পর গত ৭ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দলের কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় ঘোষণা দেন যে আগামী নির্বাচন ইভিএমে হবে। সিইসির কথার সুর এরপরই পরিবর্তন হতে থাকে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের দুই দিন পর সিইসি বলেন, এ বক্তব্যে কমিশন কোনো চাপ অনুভব করছে না। তবে তিনি এটাও বলেন, প্রধানমন্ত্রী, নাকি আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে কথাটি বলা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তাঁর কথায়, এ ইঙ্গিত ছিল, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটা বলা হলে কমিশনের কাছে তা ভিন্নভাবে বিবেচ্য হতে পারে।

রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে সিইসির বৈঠকে ক্ষমতাসীন দল বাদে অধিকাংশ দল, সংগঠন ও ব্যক্তি ইভিএমের বিরুদ্ধে মতামত দেয়। সংলাপের শেষ দিনে সিইসি নিজেই বলেছিলেন, ‘অধিকাংশ দল ইভিএমে বিশ্বাস করছে না। এর ভেতরে কী যেন একটা আছে।’ এর মধ্যে কুমিল্লা সিটির নির্বাচনে ইভিএমের ভোট নিয়েও সৃষ্টি হয় নানা বিতর্ক। কিন্তু দিন শেষে সংলাপের চেনা পরিণতি নিয়েই হাজির হয়েছেন সিইসি। দুই দিন আগে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৫০টি আসনে ভোট হবে ইভিএমে।

বলা যেতে পারে, নির্বাচন কমিশনের এ সিদ্ধান্ত পুরোপুরি আওয়ামী লীগের প্রস্তাব অনুযায়ী হয়নি। আওয়ামী লীগ প্রস্তাব করেছিল ৩০০ আসনে ইভিএমের। ১৫০ আসনে ইভিএমের প্রস্তাব করেছিল আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী তরীকত ফেডারেশন। তরীকত রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রায় অজ্ঞাত হলেও বিশেষ বিশেষ সময়ে তাদের পরামর্শে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো হতে দেখা গেছে। কেন ইভিএম প্রশ্নে এবারও তা–ই হয়েছে, কেন আওয়ামী লীগ খুশি ও লাভবান হয়—এমন প্রস্তাবই তারা দেয়, তা বোঝা অবশ্য দুঃসাধ্য নয়। তরীকত আওয়ামী লীগের ছদ্মকণ্ঠ না হলে তো এটা হওয়ার কথা নয়।

অতীতের মতো এবারেও তরীকতের প্রস্তাবমাফিক নেওয়া সিদ্ধান্তে লাভবান হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের। অন্য অনেকের মতো আওয়ামী লীগের মহাজোটের পুরোনো সঙ্গী জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এ মতামত দিয়েছেন। ইভিএমে ভোট হওয়ার ঘোষণা আসার আগের দিন তিনি বলেছেন, কারচুপি করতেই ইভিএমে ভোট গ্রহণ করতে চাইছে ক্ষমতাসীনেরা। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে এখানে একটা ন্যায়সংগত প্রশ্ন করার সুযোগ আছে। প্রশ্নটি হচ্ছে, কারচুপি তো ইভিএম ছাড়াই গত দুটি নির্বাচনে হয়েছে, কারচুপির জন্য ইভিএমের প্রয়োজন কী? এ প্রশ্নের উত্তর নিহিত আছে দেশ ও বিদেশের বর্তমান পরিস্থিতির ভেতর। ২০১৪ সালের নির্বাচনে কোনো বিদেশি পর্যবেক্ষক ছিল না, ২০১৮ সালের নির্বাচনে তাদের অনেককে পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এবার আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ভিন্ন। বহু বছর পর উন্নয়ন সহযোগী অনেক দেশ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের তাগিদ দিচ্ছে।

আগেরবারের মতো আগামী নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থী, নেতা, এজেন্ট ও কর্মীদের পিটিয়ে, গুলি করে, ঘরে আটকে রেখে ও ভুয়া মামলা দিয়ে প্রকাশ্য দমন করা তাই সহজ হবে না। ইভিএমের নির্বাচনে কারচুপি করতে চাইলে এসব ঝামেলা করতে হবে না। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন করে, গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের খুশি করে শুধু ডিজিটাল কারচুপি করে নির্বাচনের ফলাফল বদলে দেওয়া সম্ভব হয় ইভিএমে। ইভিএমে কারচুপি ঠেকানোর একমাত্র পথ হচ্ছে এর সঙ্গে কাগজে ভোটের প্রতিলিপি রাখার মেশিন সংযুক্ত রাখা ও কারচুপির অভিযোগ এলে সেটির ভিত্তিতে ফলাফল রিকাউন্ট করা। এটি না থাকার কারণে গত কুমিল্লা মেয়র নির্বাচনে শেষ মুহূর্তে ফলাফল পাল্টে যাওয়ার পর সংক্ষুব্ধ প্রার্থী তা চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী আইনের পরিপন্থী।

এরপরও সিইসি বলেছেন যে আগামী নির্বাচনে ইভিএমের সঙ্গে এই মেশিন সংযুক্ত করবে না নির্বাচন কমিশন (২৫ আগস্ট, ডেইলি স্টার)। তিনি নাকি এক্সপার্টদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন এটি করা না হলে সমস্যা হবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন এক্সপার্টরা এসব বলেছে, তরীকতের মতো কেউ? আগের নির্বাচনে ইভিএম ক্রয় নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। ভারতের চেয়ে ১১ গুণ বেশি দাম দিয়ে কেন তখন ইভিএম মেশিন কেনা হয়েছিল, তার তদন্তের দায় অনুভব করেনি সরকার। এবার আরও বেশি আসনের জন্য এই মেশিন কিনলে হাজার কোটি টাকার মতো খরচ হয়ে যাবে কমিশনের। দেশে কৃচ্ছ্রের সময়ে এত টাকা খরচ করে কারচুপির বিতর্ক উসকে দেওয়ার গরজ কেন অনুভব করছে কমিশন?

সিইসি নিজে বলেছেন, আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দলগুলোর মতামত কমিশনের কাছে মুখ্য ছিল না, কীভাবে ভোট হলে সুষ্ঠু হবে, সেটাই মুখ্য বিবেচনা ছিল। প্রশ্ন আসে, তাহলে এত আয়োজন করে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করা হলো কেন? আর ইভিএমে সুষ্ঠু ভোট হয়, সেটা তিনি সর্বশেষ কুমিল্লা নির্বাচনের পরও কীভাবে বলতে পারেন? যেখানে নির্বাচনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করারই সুযোগ নেই, সেখানে এটা বলার আত্মবিশ্বাস তিনি কীভাবে পান?আমাদের মনে থাকার কথা, ওয়ান-ইলেভেন সরকারের শাসনামলের পর আওয়ামী লীগকে গত ১৪ বছরে কখনো ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয়নি। সেই সরকারে থাকা ক্ষমতাশালী মানুষদের কাউকে কাউকে দেশ ছাড়তে হলেও অন্যরা আওয়ামী আমলের বিশেষ পছন্দের মানুষে পরিণত হন।

বর্তমান সিইসি তাঁদের একজন। নির্বাচন কমিশনার হওয়ার আগে তিনি দু–দুবার সরকারের পছন্দে বিশেষ নিয়োগ পেয়েছেন। কমিশনের অন্য অনেকের ক্ষেত্রেও সরকারি আনুকূল্যের প্রমাণ রয়েছে। এর আগে এ ধরনের মানুষেরা নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ পেয়ে কী করেছেন, তা আমরা আগের দুটি নির্বাচনে দেখেছি। সিইসি ও নির্বাচন কমিশনকে তাই বুঝতে হবে, বাংলাদেশের মানুষের অধিকার রয়েছে তাদের কাজকর্ম গভীর সন্দেহের চোখে পর্যবেক্ষণের। ইভিএম নিয়ে সর্বশেষ সিদ্ধান্তে তারা এ সন্দেহ আরও উসকে দিয়েছে। তাদের বুঝতে হবে ইভিএমে ভোট করা সমস্যা নয়, সমস্যা এ মেশিনের অদক্ষতা, এটি চালানোর মানুষের অসততা, এই মেশিন চালানোর ঘরে থাকা সন্ত্রাসীর জোরজুলুম, এর কারচুপি চ্যালেঞ্জ করার সুযোগের অনুপস্থিতি, সর্বোপরি নির্বাচন প্রশাসনে (বিশেষ করে জনপ্রশাসন ও পুলিশ) পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিদের একাধিপত্য। এমন অবস্থায় ইভিএমের মাধ্যমে সাজানো নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা আরও সহজসাধ্য হবে এবং সাজানো নির্বাচনে সহযাত্রীদের কিছু আসনে দিয়ে নির্বাচনেও আনা যাবে। কিন্তু এতে নির্বাচনব্যবস্থাকে রক্ষা করা যাবে না বা মানুষের ভোটাধিকারকে সম্মান জানানো যাবে না। কারও ভোলা উচিত নয়, মূলত এই ভোটাধিকারকে সম্মান জানানো হয়নি বলেই আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করেছি। এ চেতনার প্রতি সম্মান দেখানোর প্রধান দায়িত্ব সিইসির মতো সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published.