মামলা ও গ্রেফতার আতঙ্কে বিএনপি

প্রায় ১৫ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি।

দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির প্রায় ৩৬ লাখ নেতাকর্মীর মাথায় ঝুলছে লক্ষাধিক মামলার খড়গ।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দলটির নেতাকর্মীদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েছে পুরনো মামলায়। মামলা ও গ্রেফতারের ভয় সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাদের।

এ অবস্থায় ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের’ মতো নতুন বিপদ হিসেবে হাজির হয়েছে ‘গায়েবি’ মামলা। জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে

ততই এ ধরনের মামলার হিড়িক পড়ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। ফলে নির্বাচনের আগে নতুন করে মামলা-হামলা-গ্রেফতারের ভয় কাজ করছে বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মনে।

দলীয় সূত্র জানায়, জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিএনপির চলমান কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গত ২২ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় মোট আসামি করা হয়েছে ২৪ হাজারের অধিক নেতাকর্মী।

বিএনপি অভিযোগ করেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলার ঘটনায় দলের ৩ নেতা-কর্মী নিহত ছাড়াও আহত হয়েছেন দুই হাজারের বেশি নেতা-কর্মী।

এসব ঘটনায় ৩২৯ জনের বেশি গ্রেফতার হয়েছেন। চার হাজারের বেশি নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ২০ হাজারের অধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে।

গত এক মাসে বিভিন্ন জেলায় দায়ের হওয়া মামলার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২২ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির ৪৯টি কর্মসূচিতে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ৫২টি স্থানে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বাড়িঘর, গাড়ি ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর হয়েছে। আর একই স্থানে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমাবেশ থাকায় প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে ২০/২৫টি স্থানে সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় যে ৪৬টি মামলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ২৯টির বাদী পুলিশ। বাকি ১৭টি মামলার বাদী আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতারা।

বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ১ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জে বিএনপি-পুলিশের সংঘর্ষকালে গুলিতে যুবদলের কর্মী শাওন প্রধান নিহতের ঘটনায় দুই মামলায় জ্ঞাত-অজ্ঞাতসহ আসামি ৫ হাজার ৯৭১ জন। এরপর গ্রেফতার আতঙ্কে বিএনপির অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া নোয়াখালীতে এ পর্যন্ত ১৪টি মামলায় ৪ হাজার ৭২৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।

বিএনপির দেওয়া তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত করা এসব মামলায় আসামি প্রায় ৩৫ লাখ ৮২ হাজার ১০৭ নেতাকর্মী। এছাড়া এই সময়ে অন্তত এক হাজার ৫৩২ জনকে হত্যা এবং কমপক্ষে এক হাজার ২০৪ জনকে গুম করা হয়েছে। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা ১১ হাজার ৩২৬ জনকে গুরুতর জখম ও আহত করা হয়েছে বলে দাবি দলটির।
নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকায় অন্তত ৩৬ মামলার বিচার কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ নেতাদের। এই মামলার বিচার কাজ শেষ হলে বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতাকে জেলে যাওয়া লাগতে পারে। রায়ে সাজা হলে অনেকেই নির্বাচনে অংশ নিতে আইনি জটিলতায় পড়বেন বলেও আশঙ্কা তাদের।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে সরকার এসব করছে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে সরকার বছরের শুরু থেকেই ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে। দেশব্যাপী প্রতিদিনই বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসহ বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, নতুন নতুন মামলা দায়ের করা হচ্ছে।

বিএনপি দাবি করেছে, তাদের আন্দোলন কর্মসূচি প্রতিহত করতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের একের পর এক হামলার পাশাপাশি পুলিশও বিভিন্ন স্থানে বাধা সৃষ্টি করেছে। এরপর এসব ঘটনায় উল্টো বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেই মামলা দেওয়া হয়েছে। এতকিছু মামলা-হামলা-হত্যা করেও বিএনপির চলমান আন্দোলন দমিয়ে রাখা যাবে না বলছেন নেতারা।

নির্বাচন আসলে আওয়ামী লীগ ষড়যন্ত্র করে। আন্দোলন যাতে না হয় সেজন্য মিথ্যে মামলা দেয়, গায়েবি মামলা দেয়। ১৬ সাল থেকে ১৮ সালের নির্বাচনের পূর্বে ২৬ হাজারের ওপর নেতাকর্মীকে মামলায় জর্জরিত করেছে।
—বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন

বিএনপি নেতা-কর্মীদের উপর হঠাৎ করে মামলা হামলা বেড়ে যাওয়ার কারণ কী জানতে চাইলে দলটির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ঢাকা মেইলকে বলেন, এগুলো হচ্ছে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা থাকার ষড়যন্ত্রের অংশ। নির্বাচন আসলে আওয়ামী লীগ ষড়যন্ত্র করে। আন্দোলন যাতে না হয় সেজন্য মিথ্যে মামলা দেয়, গায়েবি মামলা দেয়। ১৬ সাল থেকে ১৮ সালের নির্বাচনের পূর্বে ২৬ হাজারের ওপর নেতাকর্মীকে মামলায় জর্জরিত করেছে। তারা মনে করছে পূর্বের মতো হামলা মামলা এবং নির্যাতন করে টিকে থাকবে কিন্তু লাভ নেই। এখন মাঠ পর্যায়ে নেতাকর্মীরা প্রতিরোধ করা শুরু করেছে।

তিনি আরও বলেন, ২০১৪ এবং ১৮ সালে যে ষড়যন্ত্র করেছে সেটা আর আওয়ামী লীগ পারবে বলে আমি মনে করি না। মামলা হামলা করেও আর লাভ হবে না, এখন প্রতিরোধ শুরু হয়েছে। আমরা চাই আওয়ামী লীগ মাঠে আসুক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক। কিন্তু কিছু পুলিশ অতি উৎসাহী আওয়ামী লীগের পক্ষ হয়ে কাজ করে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন এলাকায় যে হামলা হয়েছে তাতে এটাই প্রমাণিত হয়েছে। তাহলে তারা রিজাইন দিয়ে আওয়ামী লীগে জয়েন করুক। পুলিশ যদি নিরপেক্ষ হয় তাহলে আওয়ামী লীগ মাঠে ১০ মিনিটও টিকবে না, কোথাও দাঁড়াতে পারবে না।

জানতে চাইলে দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ঢাকা মেইলকে বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে এক লাখ মামলায় আমাদের ৩৫ লাখের বেশি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। মামলার ভয় দেখিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে তা দমন করতে চায়। তারা আবার নতুন করে শুরু করেছে যে ঘরে থাকতে দেবে না, স্বস্থিতে থাকতে দেবে না, পুরাতন কায়দায় তারা আবার আন্দোলনকে দমাতে চাইছে। সে কারণেই নতুন করে মামলার সংখ্যা বাড়ছে। এভাবে মামলা হামলা নির্যাতনের মাধ্যমে ক্ষমতা থাকা সম্ভব নয়।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে এক লাখ মামলায় আমাদের ৩৫ লাখের বেশি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। মামলার ভয় দেখিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে তা দমন করতে চায়।
—বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু

দুদু বলেন, পুরাতন পথ গ্রহণ করার কারণে আমার কাছে মনে হয় মামলা হামলা বাড়ছে। নারায়ণগঞ্জে পুলিশ আমাদের এক কর্মীকে গুলি করে হত্যা করেছে আবার পুলিশে পাঁচ হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা দিয়েছে। পুলিশের ধারণা হচ্ছে এগুলো মনে হয় দেশের জনগণ দেখছে না, অন্ধ। স্বাভাবিক কারণে মামলা হামলা বেড়ে গিয়েছে। বিএনপির চলমান কর্মসূচিতে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হচ্ছে। আগের মতো মামলা হামলায় বিএনপির আন্দোলনমুখী যে জন স্রোত সেটা ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। নিশ্চিতভাবে সরকার ত্যক্ত হচ্ছে এবং আগামী দিনে ব্যর্থ হবে। সবকিছু হচ্ছে জনগণের জন্য জনগণের স্বপক্ষে কাজ করা, স্বাধীনতার স্বপক্ষে কাজ করা। মানুষের যে অভাব অনটন এটার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। জনগণই এক সময় নেমে পড়বে তখন এটা পরিপূর্ণ সফল হিসেবে চিহ্নিত হবে।

জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সামনের নির্বাচন আসতেছে তাই নতুন করে গায়েবী মামলা শুরু হয়েছে। সব সময় নির্বাচনের পূর্বে মামলা গ্রেফতার করে নেতা কর্মীদের আতঙ্কে রাখতে চায় সরকার। এছাড়া আমাদের চলমান সভা সমাবেশে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে সরকারের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সভা সমাবেশে মানুষ যাতে অংশগ্রহণ না করে এজন্য মামলা ও হামলা করা হচ্ছে।

সামনের নির্বাচন আসতেছে তাই নতুন করে গায়েবী মামলা শুরু হয়েছে। সব সময় নির্বাচনের পূর্বে মামলা গ্রেফতার করে নেতা কর্মীদের আতঙ্কে রাখতে চায় সরকার। এছাড়া আমাদের চলমান সভা সমাবেশে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে সরকারের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
—আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সদস্য, বিএনপির স্থায়ী কমিটি

তিনি আরও বলেন, যত কিছুই করা হোক না কেনো কিছুতেই এবার মানুষকে থামানো সম্ভব নয়। সকল কিছু মোকাবেলা করার জন্য মানুষ এবার প্রস্তুত হচ্ছে। শুধু বিএনপির নেতাকর্মীরা নয়, সাধারণ মানুষও প্রস্তুতি নিচ্ছে। মামলা হামলার ভয় দেখিয়ে আর জন স্রোত কিছুতেই থামানোর সম্ভব নয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, মামলা আর হামলা যতই করা হোক না কেন এতে তাদের স্বপ্ন পূরণ হবে না। মামলা একটি দুইটি হলে ভয় থাকে, যেখানে একাধিক মামলা হয়ে যায় তখন আর এসব বিষয় নিয়ে ভয়ের কোনো কারণ থাকে না। আমার বিরুদ্ধেই ৬০টির মতো মামলা রয়েছে। আমাদের এমন কোনো নেতাকর্মী নেই যাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়নি। নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগ সবসময়ই এরকম মামলা হামলা করে থাকে এটা নতুন কিছু নয়।
সুত্রঃ ঢাকা মেইল

Leave a Reply

Your email address will not be published.