কর্নেল অলির সর্বশেষ ঘোষণার মাজেজা

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ যিনি ‘কর্নেল অলি’ হিসেবে সমধিক পরিচিত; বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় বলেছেন,

তাঁর দলের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও নাগরিক ঐক্য ‘আগামী সরকার পতনের আন্দোলনে’ বিএনপির সঙ্গে থাকবে। তাঁর এ ঘোষণা আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

কর্নেল অলি ২০১২ সাল থেকেই বিএনপির জোটসঙ্গী; জামায়াতও তাই। অবশ্য জামায়াতের বর্তমান আমিরের যে বক্তব্য কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, সেখানে তিনি বিএনপির সঙ্গে আর জোটে না থাকলেও আন্দোলনে থাকার কথা বলেছেন।

ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য ২০১৮ সালের নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির উদ্যোগে ড. কামালের নেতৃত্বে ‘ঐক্যফ্রন্ট’ নামে যে জোট গঠিত হয়েছিল, সেটার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল।

সম্প্রতি বিএনপির সঙ্গে সংলাপ করেও দলটি সরকারবিরোধী আন্দোলনে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। অর্থাৎ দল তিনটি যেখানে এমনিতেই বিএনপির আন্দোলনের মিত্র বলে ঘোষিত, সেখানে অলির নতুন করে এমন ঘোষণা দেওয়ার মানে কী?

সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানে অলির ওই ঘোষণার সময় তাঁর পাশে বসা ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল

আবদুল হালিম এবং নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। অলির ঘোষণার বিষয়ে ওই অনুষ্ঠানেই হালিম সম্মতিসূচক মন্তব্য করলেও মান্নার গলায় ছিল একটু ভিন্ন সুর।

সমকালের ওই প্রতিবেদনমতে, পরদিন শুক্রবার মান্না বলেন, সরকার পতনের অভিন্ন দাবিতে ভিন্ন আদর্শের দলগুলোর যুগপৎ আন্দোলনে তাঁর দল সব সময় সমর্থন দিয়ে আসছে; তবে কোনো একটি দলের কর্মসূচি সামনে রেখে তাঁর দলসহ কয়েকটি দলের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন তথা জোট গঠনের তথ্য সঠিক নয়। (সমকাল, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২)।

মান্নার বক্তব্য থেকে পরিস্কার- অলি আসলে ওই ঘোষণার মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, তাঁর দল, জামায়াত ও নাগরিক ঐক্য আলাদা জোট তৈরি করছে এবং এ জোট নিয়েই তাঁরা বিএনপির ভবিষ্যৎ আন্দোলনে অংশ নেবেন। অর্থাৎ, জোটের ভেতরে জোট গঠনের প্রয়াসের ইঙ্গিত আছে বলেই অলির ওই ঘোষণা বিশ্নেষকদের নজর কেড়েছে।

সমকালের প্রতিবেদনে বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে বলা হয়েছে, গত কয়েকদিন ধরে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান বলে আসছেন, কর্নেল অলি সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারার সভাপতি বি চৌধুরীর সঙ্গে মিলে নতুন এক বিএনপি তৈরি করছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অলি বিএনপির সঙ্গে ঐক্যের প্রশ্নে নিজের অবস্থান পরিস্কার করার জন্য বৃহস্পতিবার ওই ঘোষণা দেন। বাস্তব চিত্রটা এত সরল বলে মনে হয় না। বিশেষ করে, ২০১৯ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থাকা অবস্থায় জামায়াতসহ কয়েকটি শরিক দলকে নিয়ে অলির জোটের ভেতরে জোট গঠনের প্রয়াসের কথা যাঁদের মনে আছে তাঁরা বুঝবেন বিষয়টা। তখনও অনেকটা মায়ের চেয়ে মাসির বেশি দরদ দেখানোর মতো অলি তাঁর ওই তৎপরতার অন্যতম উদ্দেশ্য বিএনপি চেয়ারপারসন দুর্নীতির দায়ে ১০ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা বলে ঘোষণ দিয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি এর মধ্যে অন্যকিছুর গন্ধ পেয়ে তখন অলির ওই তৎপরতার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। তাই তা খুব বেশি দূর এগোতে পারেনি।

অলির বারবার জোটের ভেতরে জোট গঠনের চেষ্টাকে খুব সহজেই সরকারবিরোধী রাজনীতির নেতৃত্ব নিজের হাতে নেওয়ার প্রয়াস হিসেবে বর্ণনা করা যায়। বিষয়টা এখানেই থেমে থাকবে বলে মনে হয় না। অলি কি বিএনপির বাড়া ভাতে ছাই দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন?

মনে রাখা যেতে পারে, অলি ২০০৬ সালে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ বিএনপির মূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতিসহ বহু অভিযোগ তুলে দলটি ছেড়ে এলডিপি গঠন করেছিলেন। যোগ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে। ২০০৭ সালে ১/১১-এর সরকারের সময় মহাজোট থেকে বের হয়ে হয়ে যান তৎকালীন ছদ্মবেশী সামরিক সরকারের সমর্থক। ২০১২ সাল থেকে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ রাজনীতি করলেও কখনোই দলটিকে তিনি স্বস্তি দেননি। বিএনপির সঙ্গে তাঁর টানাপোড়েনের কারণেই ২০১৯ সালে একবার এবং পরবর্তী সময়ে আরেকবার অলির দলটি ভাঙনের মুখে পড়ে। এই যে একবার এই ঘাট তো আরেকবার অন্য ঘাটের জল খেয়ে অলির রাজনীতিতে টিকে থাকার চেষ্টা, তা সহজে শেষ হবে বলে মনে হয় না।

অলি রাজনীতি শুরু করেছিলেন জেনারেল জিয়ার হাত ধরে সরাসরি সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে। মাঝখানে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে কিছু ভূমিকা রাখলেও পোড় খাওয়া রাজনীতিক বলতে যা বোঝায়, অলি মোটেই তা নন। অনেকটা বিনা ক্লেশে ক্ষমতার মধু ভোগ করেছেন। অলির এ দিকটি সম্পর্কে বিএনপির অজ্ঞাত থাকার কথা নয়। তবে বিএনপির রাজনীতিতে নানা কারণে এখনও অলির যে প্রভাব, তার কারণে বিএনপি না পারছে অলিকে ফেলতে, না পারছে গিলতে।

সুত্রঃ সমকাল
সাইফুর রহমান তপন: সাংবাদিক ও সাবেক ছাত্রনেতা

Leave a Reply

Your email address will not be published.