আন্দোলনে সফলতা পেতে নেতা ঠিক করতে হবে বিএনপিকে

বিএনপিকে আন্দোলনে নূন্যতম সফল হতে হলে অবশ্যই নেতৃত্ব সংকটের সমস্যা সমাধান করতে হবে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরা থাকা দলটির নেতাকর্মীরা কোনঠাসা অবস্থায়ও সম্প্রতি রাজপথে বেরিয়ে আসছে।

বিএনপির রাজপথে নামা নেতাকর্মীর এই নতুন পরিস্থিতিকে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে ধারণ করা সবার আগে দরকার। সারা দেশের এসব মাঠের নেতা কর্মী সংগঠককে নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপিকে সুসজ্জিত করা চ্যালেঞ্জও বটে।

রাজপথে সাহসের সঙ্গে লড়াই করা তেজি কর্মীরাই বিএনপির প্রাণ। কর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা বা পুলিশের মারমূখি ভূমিকার মধ্যেও বিএনপি

দীর্ঘ দিন পর মাঠে নেমেছে। দ্রব্যমূল্যর উর্ধগতি, সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়কে সামনে রেখে বিএনপিকে আগামিদের আন্দোলন ও কর্মসূচি সাজাতে হবে।

তাহলে সাধারণ মানুষের সমর্থন প্রত্যক্ষভাবে রাজপথেও দৃশ্যমান হবার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে বাস্তবতা উঠে

এসেছে তাতে পরিষ্কারভাবে প্রমাণ হয়েছে যে ধার করে অন্যদলের লোক দিয়ে বিএনপির নেতৃত্ব পূরণ করা সম্ভব না। দাড়াতে হতে হলে দলের নেতাদেরকেই সেই দায়িত্ব নিতে হবে।

বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে একটি উদারমধ্যপন্থি দল হিসেবে পরিচিত। দলটির অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা এসেছেন পিকিংপন্থি বাম দলগুলো থেকে যার বড় অংশ ছিল ভাসানী ন্যাপের নেতা কর্মী।

আওয়ামী লীগে যেমন রুশপন্থি বামদের একটা বড় অংশ রয়েছে, তেমনি ব্যালান্স হিসেবে পিকিংপন্থি বামদের বড় অংশ রয়েছে বিএনপিতে। কিন্তু ২০০১ সালে জামাতের সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি মাত্রাতিরুক্ত দক্ষিণে ঝুকে পড়ে।

দেশ ও দেশের বাইরে বিএনপির বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ ওঠে যে, দলটিতে ’মৌলবাদে’ ঝোক বাড়ছে। এতে উদারমধ্যপন্থি দল হিসেবে যে সুনাম ছিল তা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

বর্তামান বস্তবাতায় দেশীয় রাজনীতি বলে কিছু নেই। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় রাজনীতি গ্লোবাল রাজনীতির অংশ হয়ে দাড়ায়। বৈশ্বিক সমর্থন, নীতিগত বিষয়ে ঐক্যমতে পৌছানো, মানবাধিকার, সুশাসন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতাসহ নানান কিছু আজকের দিনে আর কোনো একটা দেশের একার বিষয় না। বিএনপির দক্ষিণপথে ঝোকার কারণে গ্লোবাল ফেনোমেনা বড় ক্ষতি হয়। সেই সুযোগে বিএনপি বিরোধী শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে দলটিকে জামাতের সহযোগী পার্টি হিসেবে প্রচার করে এবং নির্বাচন এগিয়ে আসায় সেই হাওয়া আরও তীব্রতর করেছে।

আজ যখন বিএনপি ও জামাত দুটি স্বতন্ত্র ধারার রাজনীতি এবং পৃথক থাকার সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে তাতে বিএনপির বিরুদ্ধে জামায়াত তোষণের রাজনীতিটা ভোতা হবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বরং বামপন্থিদের একাংশের সঙ্গে বিএনপির ঐক্য হবার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তাতে বিএনপিকে দেশে ও দেশের বাইরে একটি উদারমধ্যপন্থি দল হিসেবে ফের সামনে আনার সুযোগ এসেছে। এই সুযোগ বিএনপির নেতাদের কাজে লাগাতে হবে।

জামাতের পক্ষ থেকে সব সময় প্রচার করা হতো তারা ছাড়া বিএনপি এককভাবে রাজপথে আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করতে পারবে না, তাদের সেই সাংগঠনিক শক্তি নেই। বাস্তবে দেখা গেলো ভিন্ন সত্য। জামাত ছাড়াই বিএনপি তার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশে বড় শক্তির শোডাউন দিয়েছে। এর মধ্যে নারায়ানগঞ্জে দলটির প্রতিষ্টাবার্ষিকীর দিনে সমাবেশে গুলিতে একজন মারা যায়। আর ভোলায় বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদের বিক্ষোভে জেলা ছাত্রদল সভাপতি মারা যায়। এই আত্মদানের মধ্য দিয়ে বরং বিএনপি সারা দেশে চাঙ্গা হয়েছে। জামাত ছাড়াই বরং বিএনপির এই রাজপথে নেমে আসা সরকারি দলকেও হতবাক করে দিয়েছে।

এই তেজি বিএনপির ধারাটিকে দলের হাইকমান্ডকে ধারণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে দলটির নেতারা যদি আবারও ড. কামাল হোসেনের মত বাইরে থেকে নেতা হায়ার করে তাহলে আগামি জাতীয় নির্বাচনেও ভরাডুবি হবে।

তাহলে সমাধান কোথায়?

এক্ষেত্রে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যদি ভাবে বিদেশ থেকে দল পরিচালনা করে আওয়ামী লীগকে মোকাবেলা করবে- তাহলে সেই আন্দোলনে কর্মীদের শক্তিক্ষয়- নির্বাচনে ব্যার্থতা ছাড়া অন্য কোন নজির নেই। শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি ছাড়াই কোন ধরনের সফলতা আসবে, এটা কি বিএনপির নেতা-কর্মীরাই কেউ বিশ্বাস করে কিনা জানিনা! নিরদলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যে বৃহত্তর আন্দোলনের কথা বলছে- আন্দোলনের এক পর্যায়ে অবশ্যই তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের সমস্যা সমাধান দিতে হবে।

মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধুর মত নেতার উত্তরসূরীকে সমস্ত প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করে জীবনের ঝুকি নিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে। দলের শীর্ষ নেতা নির্বাচিত হয়ে দেশে ফিরেই হয়নি। আন্দোলন- সংগ্রাম পনের বছর ধরে চালিয়ে যাওয়াট পর ৯৬ তে সফলতা এসেছে। অতএব শুধু শীর্ষ নেতা নির্বাচন হলেই হবে না, দেশে ফিরে সেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে নেতা-কর্মীদের পাশে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে।

বিএনপিতে তেমন কোন সম্ভাবনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে বিএনপির হাতে কিন্তু একটা সমাধান রয়েছে। আন্দোলনের স্বার্থে, কর্মীদের উৎসাহ- উদ্দীপনার প্রতি আস্থা রেখে বা ত্যাগের প্রতি দায়বদ্ধতার দরুন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের জন্য বিএনপিকে নেতৃত্ব নিয়ে অবশ্যই একটি সিদ্ধান্তে পৌছাতে হবে। যিনি আন্দোলনের কেন্দ্রে থাকবেন তাকে কোন না কোন ভাবে চিফ- অথরিটি হতে হবে। সেকেন্ড ম্যান দিয়ে সংলাপ পর্যন্ত হতে পারে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ন মুহুর্তে সিদ্ধান্ত গ্রহন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে বিএনপির হাতে একটি সহজ সমাধান কিন্তু রয়েছে। আর সেটি হচ্ছে মির্জা ফখরুলের হাতেই দায়িত্ব দেয়া।

তবার ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে ড. কামাল হোসেনকে শীর্ষ নেত্বত্ত্ব মেনে যদি নির্বাচনে ঝাপিয়ে পড়তে পারে। তবে এবার আন্দোলনের পূরো ভাগে দলের মহাসচিব যে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাকে কেন নেতৃত্বের সেই আসনে বসানো যাবে না?! বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়াম্যান তারেক রহমান দেশে না ফিরলে, এর কোন বিকল্প দলটির আছে বলেও মনে হয় না। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে ভারসাম্যের প্রয়োজনে বিদেশে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে স্বপদে রেখেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। সেটি হচ্ছে বর্তমান সংগ্রামরত মহাসচিবকেই আন্দোলনের চিফ-অথরিটি এবং পরবর্তী বিএনপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী ঘোষনা করা।

লেখক : সাংবাদিক
সুত্রঃ বাংলা ভিশন

Leave a Reply

Your email address will not be published.